শরতের শুভ্র কাশফুল, নীল আকাশ আর স্নিগ্ধ বাতাসের ছোঁয়া নিয়ে প্রতি বছর আগমন ঘটে শারদীয় দুর্গোৎসবের। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস, গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য এবং অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনবদ্য ঐতিহ্য।
পৌরাণিক কাহিনী থেকে জানা যায়, সনাতন ধর্মে দেবীর আসল পূজা হতো বসন্তকালে, যা বাসন্তী পূজা নামে পরিচিত। তবে ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র লঙ্কাজয়ের উদ্দেশ্যে এবং রাবণ বধের জন্য শরৎকালে দেবী দুর্গার অকাল আহ্বান বা ‘অকাল বোধন’ করেছিলেন। সেই থেকে শরৎকালের এই পূজা শারদীয় দুর্গোৎসব নামে প্রসার লাভ করে। শ্রীশ্রী চণ্ডীর বর্ণনায় রয়েছে, মহিষাসুরের অত্যাচারে স্বর্গচ্যুত দেবতারা যখন অসহায় হয়ে পড়েছিলেন, তখন সব দেবতার সম্মিলিত শক্তির তেজ থেকে জন্ম নেন দেবী দুর্গা।
ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে দেখা যায়, রাজপ্রাসাদ ও জমিদার বাড়ির চারদেওয়াল থেকে বেরিয়ে এসে এই উৎসব আজ কীভাবে সাধারণ মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। ষোড়শ শতাব্দীতে রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ সেন রায় ব্যাপক আয়োজনে যে মহোৎসবের সূচনা করেছিলেন, তা কালক্রমে রূপ নেয় বারোয়ারি ও সর্বজনীন দুর্গোৎসবে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হওয়ার মধ্য দিয়েই দুর্গোৎসবের সামাজিক ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হয়।
এই উৎসবের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর ও জীবনমুখী। দেবী দুর্গা দশ হাতে নানা অস্ত্র নিয়ে মহিষাসুরকে বধ করেন, যা সমাজ ও মনের ভেতরকার অন্যায়, অহংকার ও হিংসার মতো অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে সত্য ও সুন্দরের জয়ের বার্তা দেয়। একই সাথে এটি মাতৃশক্তি ও নারীশক্তির জয়গান গায়। অন্যদিকে, দেবী উমার চার সন্তানকে নিয়ে মর্ত্যে বাপের বাড়িতে আসার রূপকটি বাঙালি পরিবারের ভালোবাসার বন্ধন ও নাড়ির টানে ঘরে ফেরার আকুলতাকে ফুটিয়ে তোলে।
তবে দুর্গোৎসবের সবচেয়ে সুন্দর ও শক্তিশালী দিক হলো এর অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। সময়ের সাথে সাথে এই পূজা কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের আয়োজনে আটকে থাকেনি, বরং হয়ে উঠেছে আবহমান বাংলার সম্প্রীতির এক অনন্য উপাখ্যান। মণ্ডপে আলোর রোশনাই, ঢাকের শব্দ আর আনন্দে মেতে উঠতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এক সাথে শামিল হন। প্রতিমা তৈরি থেকে শুরু করে আলোকসজ্জা, ঢাক বাজানো কিংবা মেলার আয়োজন—সমাজের প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই উৎসবের সাথে যুক্ত হয়ে পারস্পরিক সৌহার্দ্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
পূজা শেষে বিজয়া দশমীর বিসর্জনের আবহ এক বুক বেদনার হলেও তা রেখে যায় সম্প্রীতির অমলিন বার্তা। ভেদাভেদ ভুলে মিষ্টিমুখ করানো, কোলাকুলি করা আর কুশল বিনিময়ের মাধ্যমে মানুষ আবার নতুন করে সম্পর্কের সেতু গড়ে তোলে। শারদীয় দুর্গোৎসব তাই কেবল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নয়; এটি সত্যের জয়গান, ভালোবাসার বন্ধন এবং আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার চিরন্তন প্রতীক।
( মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সম্পাদক)