বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে ৩৩৫.৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণচুক্তি করেছে বাংলাদেশ ও চীন। গত ১০ অক্টোবর ঢাকায় স্বাক্ষরিত এ চুক্তির আওতায় বন্দরটির সক্ষমতা বাড়ানো এবং আধুনিক পণ্য ওঠানো-নামানোর অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ভারতের সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত এই বন্দরের আধুনিকায়নে চীনের অর্থায়ন আঞ্চলিক ভূরাজনীতি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বঙ্গোপসাগরে ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মোংলা বন্দর বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বন্দরটির ভৌগোলিক অবস্থান বঙ্গোপসাগর ও পূর্ব ভারতের সামুদ্রিক যোগাযোগের বিবেচনায়ও তাৎপর্যপূর্ণ। ফলে প্রকল্পটিকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ হিসেবে দেখলেও ভারতের কৌশলগত মহলে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
তবে চীনের অর্থায়নে বন্দর সম্প্রসারণ হলেই সেটি সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখানে নেই। প্রকল্পটির বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে এর পরিচালনাব্যবস্থা, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, নিরাপত্তা নীতি এবং ভবিষ্যতে বন্দরটি কীভাবে ব্যবহৃত হয় তার ওপর।
ঋণচুক্তির শর্ত ও প্রকল্পের পরিধি
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শনিবার ঢাকায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) যুগ্ম সচিব আলিয়া মেহের এবং চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের (এক্সিম ব্যাংক) সহকারী মহাব্যবস্থাপক ফেংজুন তিয়ান চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘মোংলা বন্দরের সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’।
চুক্তি অনুযায়ী, প্রকল্পের জন্য ঋণের পরিমাণ ৩৩৫.৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা চীনা মুদ্রায় ২.৪০৪ বিলিয়ন ইউয়ান এবং বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ৫৯২ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ঋণের সুদের হার বার্ষিক ২ শতাংশ। ঋণ পরিশোধের মোট মেয়াদ ২০ বছর, যার মধ্যে প্রথম পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড বা ঋণ পরিশোধে ছাড়ের সময় হিসেবে নির্ধারিত।
প্রকল্পের আওতায় দুটি আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ, পণ্য ওঠানো-নামানোর জন্য নির্দিষ্ট ইয়ার্ড ও ভারী পণ্য সংরক্ষণের অবকাঠামো তৈরি, আধুনিক কোয়ে গ্যান্ট্রি ক্রেন স্থাপন এবং স্বয়ংক্রিয় পণ্য ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বড় ধারণক্ষমতার জাহাজ চলাচল সহজ করতে পশুর নদে খনন ও নৌপথ প্রশস্ত করার বিষয়ও রয়েছে।
এসব অবকাঠামো বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরে কনটেইনার ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জাহাজের অপেক্ষার সময় কমানো, পণ্য ওঠানো-নামানোর গতি বাড়ানো এবং আমদানি-রপ্তানিকারকদের ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব সুফল কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, পরিচালন দক্ষতা এবং বন্দরের সঙ্গে সড়ক, রেল ও নৌযোগাযোগের সমন্বয়ের ওপর।
কেন গুরুত্বপূর্ণ মোংলা বন্দর?
পশুর নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত মোংলা বন্দর বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ৭১ নটিক্যাল মাইল অভ্যন্তরে। দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করছে। চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ ও পণ্য পরিবহনের চাপ বাড়ায় বিকল্প সক্ষমতা তৈরির প্রয়োজনীয়তা থেকেই মোংলা বন্দরের উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকার।
পদ্মা বহুমুখী সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ সহজ হয়েছে। এর ফলে মোংলা বন্দরে পণ্য পরিবহনের সম্ভাবনা বেড়েছে। দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানি, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি এবং ভারী ও বাল্ক পণ্য পরিবহনে বন্দরটি আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মোংলা বন্দরের অবস্থান সুন্দরবনের কাছাকাছি হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিবেশগত বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বন্দর সম্প্রসারণ, নদী খনন ও জাহাজ চলাচল বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সুন্দরবনের প্রতিবেশ, নদীর প্রবাহ এবং স্থানীয় জীবিকার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বাণিজ্যিক গুরুত্বের পাশাপাশি বন্দরটি আঞ্চলিক যোগাযোগের জন্যও সম্ভাবনাময়। বাংলাদেশি অবকাঠামো ও ট্রানজিট সুবিধা কাজে লাগিয়ে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে পণ্য পরিবহনের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় মোংলা বন্দরের ভূমিকা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশ অবকাঠামো সহযোগিতায় কী পরিবর্তন এসেছে?
মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ প্রকল্পটি একসময় ভারত-বাংলাদেশ অবকাঠামো সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হওয়ার কথা ছিল। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় ঋণসহায়তা বা লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) কাঠামোর আওতায় প্রকল্পটির একটি বড় অংশে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ভারতের মুম্বাইভিত্তিক হিরানন্দানি গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এভিটা কনস্ট্রাকশনসকে মোংলা বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণকাজ ও টার্মিনাল উন্নয়নের দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু প্রশাসনিক বিলম্ব, জমি বরাদ্দ নিয়ে বিরোধ, প্রকল্পের পরিধিতে পরিবর্তন এবং ঢাকার রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে পরিকল্পনাটি বাধাগ্রস্ত হয়। শেষ পর্যন্ত ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত কাজের বরাদ্দ বাতিল হয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর চীনের এক্সিম ব্যাংক ৩৩৫.৭৮ মিলিয়ন ডলারের ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। ফলে প্রকল্পটির অর্থায়নে চীনের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। চীনা অর্থায়নের পাশাপাশি দেশটির প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানগুলো নির্মাণ ও সরঞ্জাম সরবরাহের কাজে যুক্ত হলে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নে বেইজিংয়ের উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান হতে পারে।
তবে প্রকল্পে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাতিল হওয়ার পেছনে ঠিক কোন কারণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট চুক্তি, সরকারি নথি এবং উভয় দেশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রয়োজন। শুধু ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে চীনা অর্থায়ন যুক্ত হওয়াকে দুই দেশের কৌশলগত প্রতিযোগিতার নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবে দেখা যথাযথ হবে না।
চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশল নিয়ে ভারতের উদ্বেগ
ভারতের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত বিশ্লেষকদের আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ বা ‘মুক্তার মালা’ ধারণাটি উঠে এসেছে। এ ধারণা অনুযায়ী, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের অর্থায়ন, নির্মাণ কিংবা পরিচালনায় বিভিন্ন বন্দর ও সামুদ্রিক অবকাঠামো গড়ে ওঠার ফলে বেইজিংয়ের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ বাড়তে পারে।
পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দর, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর, মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর এবং আফ্রিকার জিবুতিতে চীনের সামরিক ঘাঁটিকে এ আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে এসব স্থাপনার মালিকানা, পরিচালনাব্যবস্থা ও সামরিক ভূমিকা এক নয়। তাই সব প্রকল্পকে একই ধরনের সামরিক কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
মোংলা বন্দরে চীনের অর্থায়নকে এই বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে দেখছে কিছু বিশ্লেষক। তাদের আশঙ্কা, বন্দরটিতে গভীর পানির জেটি, আধুনিক ক্রেন, রাডার ও ডিজিটাল পণ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা স্থাপিত হলে তা শুধু বাণিজ্যিক কার্যক্রমেই নয়, ভবিষ্যতে সামুদ্রিক নজরদারি ও সামরিক সরবরাহের মতো দ্বৈত ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য সুবিধা তৈরি করতে পারে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, কোনো অবকাঠামো বেসামরিক ও সামরিক উভয় কাজে ব্যবহারের উপযোগী হতে পারে বলেই সেটি সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে, এমন নয়। মোংলা বন্দরে চীনা নৌবাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি, সামরিক ঘাঁটি স্থাপন কিংবা ভারতীয় যুদ্ধজাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে, এমন তথ্য সরবরাহ করা প্রতিবেদনে প্রমাণসহ তুলে ধরা হয়নি।
সুতরাং ভারতের সম্ভাব্য উদ্বেগকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকির বিবেচনায় বোঝা যেতে পারে, কিন্তু নির্দিষ্ট সামরিক উদ্দেশ্যের দাবি যাচাইযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
শিলিগুড়ি করিডর ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল
ভারতের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় শিলিগুড়ি করিডর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত প্রায় ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত এই সংকীর্ণ ভূখণ্ড ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর স্থলযোগাযোগের প্রধান সংযোগপথ। ভৌগোলিক আকৃতির কারণে এটি ‘চিকেনস নেক’ নামেও পরিচিত।
মোংলা বন্দরের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তের দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ নৈকট্য এবং বঙ্গোপসাগরে বন্দরটির অবস্থানের কারণে ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা চীনের অবকাঠামোগত উপস্থিতিকে কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে পারেন।
তবে মোংলা বন্দর ও শিলিগুড়ি করিডরের মধ্যে সরাসরি সামরিক নিয়ন্ত্রণ বা তাৎক্ষণিক হুমকির সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত নয়। দুই স্থানের ভৌগোলিক নৈকট্য ভারতের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় বিবেচ্য হতে পারে, কিন্তু চীনের অর্থায়নে বন্দর সম্প্রসারণের ফলে করিডরটি সরাসরি ঝুঁকিতে পড়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে অতিরিক্ত প্রমাণ প্রয়োজন।
বঙ্গোপসাগরের নৌপথে চীনের প্রভাব কতটা বাড়বে?
বঙ্গোপসাগর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এখান থেকে মালাক্কা প্রণালির দিকে যাওয়া জাহাজগুলো পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ভারত ঐতিহাসিকভাবে বঙ্গোপসাগরকে নিজের নিকটবর্তী সামুদ্রিক নিরাপত্তা অঞ্চলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। এ অঞ্চলে চীনের বাণিজ্যিক ও অবকাঠামোগত উপস্থিতি বাড়লে ভারতের কৌশলগত হিসাবেও পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে বন্দরে অর্থায়ন, নির্মাণকাজে অংশগ্রহণ এবং বন্দরের পরিচালন নিয়ন্ত্রণ এক বিষয় নয়। মোংলা বন্দরের সার্বভৌমত্ব বাংলাদেশের হাতে থাকবে কি না, বিদেশি প্রতিষ্ঠান কতটা পরিচালনাগত ক্ষমতা পাবে এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকল্পের চূড়ান্ত চুক্তি ও বাস্তবায়ন কাঠামো থেকে পাওয়া যাবে।
ভারতের জন্য আরেকটি বিবেচ্য বিষয় হতে পারে মোংলা বন্দরের মাধ্যমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহনের সুযোগ। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান ট্রানজিট ও বাণিজ্য চুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হলে উভয় দেশই লাভবান হতে পারে। অন্যদিকে ডিজিটাল পণ্য ব্যবস্থাপনা, তথ্যের গোপনীয়তা, বন্দরের সেবা ব্যবহারের অগ্রাধিকার এবং সম্ভাব্য কূটনৈতিক বিরোধের সময়ে কার্যক্রম অব্যাহত রাখা নিয়ে নীতিগত প্রশ্ন উঠতে পারে।
এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বচ্ছ চুক্তি, তথ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা, বৈষম্যহীন পণ্য পরিবহননীতি এবং বাংলাদেশের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকা কেন চীনের অর্থায়ন বেছে নিচ্ছে?
ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রয়োজন রয়েছে। দেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের ভূমিকা বড়। এ খাতের পাশাপাশি শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য পণ্য আমদানির জন্য নির্ভরযোগ্য সমুদ্রবন্দর অপরিহার্য।
চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ ও পণ্য পরিবহনের চাপের কারণে জাহাজের অপেক্ষার সময় এবং পণ্য খালাসে বিলম্ব হতে পারে। এতে আমদানি-রপ্তানিকারকদের অতিরিক্ত খরচ গুনতে হয়। মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমানো এবং বিকল্প সমুদ্রপথের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশকে বন্দর, রেলপথ, সড়ক, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিপুল বিনিয়োগ করতে হবে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলো গুরুত্বপূর্ণ অর্থায়নকারী হলেও বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়নের শর্ত, মূল্যায়ন ও অনুমোদনপ্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হতে পারে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোও এ ধরনের প্রকল্পে অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে কাজ করছে।
মোংলা বন্দরের জন্য ঘোষিত ২ শতাংশ সুদের হার এবং ২০ বছরের পরিশোধ মেয়াদ, যার মধ্যে পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ড রয়েছে, ঋণটিকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ হিসেবে উপস্থাপন করছে। তবে ঋণের প্রকৃত আর্থিক সুবিধা মূল্যায়নে শুধু সুদের হার নয়, ঋণের অন্যান্য শর্ত, সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়, ঠিকাদার নির্বাচনের নিয়ম, মুদ্রা বিনিময়জনিত ঝুঁকি এবং প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আয়ও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’। এই নীতির আলোকে ঢাকা চীনের কাছ থেকে অবকাঠামো অর্থায়ন, ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ সহযোগিতা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে রপ্তানি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। এর লক্ষ্য হলো কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে উন্নয়ন সহযোগিতার সুযোগ কাজে লাগানো।
বাংলাদেশে চীনের অবকাঠামোগত উপস্থিতি
বাংলাদেশে চীনের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত প্রভাব গত এক দশকে বেড়েছে। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) যুক্ত হয়। ওই সফরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগ ও ঋণসহায়তার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল এবং বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বাংলাদেশের একাধিক বড় প্রকল্পে কাজ করেছে। এসব প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ দেশটির নির্মাণ ও প্রকৌশল সক্ষমতাকে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
বাণিজ্যেও চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক পণ্য এবং অন্যান্য পণ্যের বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রেও চীন একটি প্রধান উৎস। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর অস্ত্র ও সরঞ্জামের বড় অংশ চীন থেকে আমদানির কথা বলা হয়েছে।
মোংলা বন্দরের ঋণচুক্তি এ দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় নতুন সংযোজন। তবে বন্দরটির প্রকৃত পরিচালন কাঠামো, চীনা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এবং প্রকল্পের শর্ত বিশ্লেষণ না করে একে সরাসরি সামরিক সম্প্রসারণ হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না।
ভারতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে?
মোংলা বন্দরে চীনের অর্থায়ন নিয়ে ভারতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া কয়েকটি ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে। তবে এগুলো সম্ভাব্য নীতিগত পদক্ষেপের বিশ্লেষণ, ভারতের সরকারের ঘোষিত সিদ্ধান্ত নয়।
প্রথমত, ভারত নিজস্ব ও অংশীদারত্বভিত্তিক বন্দর প্রকল্পের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে পারে। মিয়ানমারের সিত্তে বন্দর ও কালাদান বহুমুখী পরিবহন প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতের কলকাতা বন্দরের সঙ্গে মিজোরামের যোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ইরানের চাবাহার বন্দর মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগের জন্য ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের গ্রেট নিকোবর এলাকায় আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর গড়ে তোলার পরিকল্পনাও ভারতের সামুদ্রিক কৌশলের অংশ।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ-ভারত যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সংযোগ আরও গভীর করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। আখাউড়া-আগরতলা রেল সংযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্য পরিবহন, ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইন এবং বিদ্যুৎ আন্তসংযোগ এ সহযোগিতার উদাহরণ। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারত যেমন উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহনের সুবিধা পেতে পারে, বাংলাদেশও আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পরিবহনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুফল অর্জন করতে পারে।
তৃতীয়ত, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনায় বন্দরের বাণিজ্যিক চরিত্র, বিদেশি সামরিক জাহাজের প্রবেশ, নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্যের সুরক্ষা এবং ভারতীয় পণ্য পরিবহনে বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকারের বিষয়গুলো উত্থাপন করতে পারে। তবে মোংলা বন্দরে চীনা যুদ্ধজাহাজের স্থায়ী ঘাঁটি বা সামরিক সুবিধা স্থাপনের কোনো নিশ্চিত পরিকল্পনার তথ্য সরবরাহ করা প্রতিবেদনে নেই।
ভারতের উদ্বেগ কি যৌক্তিক?
ভারতের উদ্বেগকে পুরোপুরি অমূলক বলা যায় না। প্রতিবেশী অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক ও সামুদ্রিক উপস্থিতি বাড়লে ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত পরিকল্পনায় তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চলে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থায়ন, পরিচালনাগত নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার নিয়ে ভারতের নজরদারি থাকা স্বাভাবিক।
তবে বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন দেশের নিজস্ব বাণিজ্যিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প। শুধু চীনের অর্থায়ন রয়েছে বলে প্রকল্পটিকে ভারতের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে উপেক্ষা করতে পারে।
এ ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন চীন না ভারত, তা নয়। বরং প্রকল্পের ঋণশর্ত কতটা স্বচ্ছ, ব্যয় ও সময়সীমা যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে কি না, বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অক্ষুণ্ন থাকছে কি না এবং বন্দরটি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সেগুলোই গুরুত্বপূর্ণ।
মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ সফল হলে বাংলাদেশ যেমন বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হতে পারে, তেমনি আঞ্চলিক যোগাযোগেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। আর প্রকল্পের পরিচালনা ও নিরাপত্তা নিয়ে স্বচ্ছতা বজায় থাকলে ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর উদ্বেগও কমানো সম্ভব।
সুতরাং চীনের ৩৩৫.৭৮ মিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি বাংলাদেশের জন্য অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ, আবার ভারতের জন্য আঞ্চলিক কৌশলগত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের একটি নতুন কারণ। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো বাংলাদেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও বাণিজ্যিক প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
সূত্রঃ ফাস্ট পোস্ট