সৌদি আরবের জাতীয় পতাকা। ছবি: রয়টার্স
দীর্ঘ ২৪ বছর সৌদি আরবে থেকেও পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে পারেননি আবদুল বাছির। দেশে ফিরে কৃষিকাজ শুরু করেছিলেন। সংসারের অভাব ঘোচানোর আশায় আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ২০২২ সালের নভেম্বরে বড় ছেলে নজরুল ইসলামকে পাঠিয়েছিলেন সৌদি আরবে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার আট মাসের মাথায় গ্রেপ্তার হন নজরুল। তখনো ঋণের সাড়ে চার লাখ টাকা পরিশোধ করা বাকি।
এরপর কেটে গেছে প্রায় তিন বছর। ছেলের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগও ছিল সীমিত। মাসে একবার ফোনে এক-দুই মিনিট কথা বলার সুযোগ পেতেন বাবা-মা। সর্বশেষ গত ১১ অক্টোবর কথা হয়েছিল তাঁদের। এর তিন দিন পর, গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) জানতে পারেন, সৌদি আরবে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
ছেলের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে শোকে ভেঙে পড়েছেন বাবা আবদুল বাছির ও মা রহিমা বেগম। এখন তাঁদের একটাই চাওয়া, ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে যেন শেষবারের মতো দেখার সুযোগ দেওয়া হয়।
নজরুল ইসলাম (২৫) ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার একটি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি আবদুল বাছির ও রহিমা বেগমের বড় ছেলে। সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কাজের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর নজরুল ও আরেক বাংলাদেশি নাগরিক সুইটি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। গত বুধবার সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানায়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা বিষয়টি জানতে পেরেছেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলা প্রশাসন কাজ করবে।
ঋণ করে ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন সৌদি আরবে
নজরুল ২০২০ সালে একটি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করেন। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের একটি কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন। তবে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় ২০২২ সালের নভেম্বরে সৌদি আরবে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে মক্কার হারাম শরিফে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন।
সৌদি আরবে যাওয়ার আট মাসের মাথায় তাঁকে গ্রেপ্তার করে দেশটির পুলিশ। গ্রেপ্তারের প্রায় এক মাস পর বিষয়টি জানতে পারে তাঁর পরিবার। এরপর থেকে সৌদি আরবের কারাগারেই ছিলেন নজরুল।
নজরুলের বাবা আবদুল বাছির দীর্ঘ ২৪ বছর সৌদি আরবে ছিলেন। ২০২০ সালে দেশে ফিরে কৃষিকাজ শুরু করেন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংকট কাটেনি। ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর জন্য আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নেন তিনি।
আবদুল বাছির বলেন, “প্রথম সাত-আট মাসে ছেলে প্রায় দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছিল। এরপর তিন বছর ধরে ছেলে সে দেশের জেলে। ছেলের এমন মৃত্যুর খবর শুনে বোনও হঠাৎ হৃদ্রোগে মারা গেল। এখন শুধু ছেলের মরদেহ দেখার অপেক্ষায় আছি।”
নজরুলের ছোট ভাইয়ের বয়স ১৪ বছর। সে স্থানীয় একটি দাখিল মাদ্রাসায় পড়ে। দুই বোনের একজনের বয়স নয় বছর, সে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। অন্য বোনের বয়স চার বছর।
ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে ফুফুর মৃত্যু
পরিবারের সদস্যরা জানান, কারাগারে থাকার সময় মাঝেমধ্যে বাবা-মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগ পেতেন নজরুল। প্রতিবারই কথা হতো এক-দুই মিনিটের মতো। গত ১১ অক্টোবরও বাবা-মায়ের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। সেটিই ছিল তাঁদের শেষ কথোপকথন।
গত বুধবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সৌদি আরব থেকে এক ব্যক্তি ফোন করে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পরিবারকে জানান।
এই খবর শুনে মূর্ছা যান নজরুলের ফুফু আবেদা বেগম (৬৫)। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ওই দিন রাত দুইটার দিকে তিনি মারা যান।
নজরুলের মা রহিমা বেগম বলেন, “ছেলেই এক মাস পরপর ফোন করত। এক থেকে দুই মিনিট কথা বলত। আমার ছেলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হইছে, তা মিথ্যা। আমি শেষবারের মতো ছেলের লাশ দেখতে চাই।”
অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন স্বজন ও বন্ধুদের
নজরুলের বিরুদ্ধে সৌদি আরবে যে অভিযোগ আনা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর স্বজন ও বন্ধুরা। তাঁদের দাবি, নজরুল ছিলেন শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের। তাঁর আচরণের সঙ্গে এ ধরনের অভিযোগ মেলে না।
নজরুলের দূরসম্পর্কের দুই চাচাতো ভাই মোস্তাকিম ভূঁইয়া ও ইমাম হাসান ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, সৌদি আরবে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করার সময় এক ব্যক্তির সঙ্গে নজরুলের বিরোধ হয়েছিল। বিষয়টি ফোনে বাবা-মাকেও জানিয়েছিলেন তিনি। ওই ব্যক্তি পাকিস্তানের নাগরিক বলে নজরুল তাঁদের জানিয়েছিলেন। স্বজনদের ধারণা, ওই ব্যক্তির ষড়যন্ত্রের কারণেই নজরুলের এমন পরিণতি হয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে তাঁরা কোনো প্রমাণের কথা জানাননি।
নজরুলের বন্ধু রাহাত ভূঁইয়া বলেন, সৌদি আরবে নজরুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নজরুল এ ধরনের কাজ করেছেন, তা তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না।
নজরুল যে দাখিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছিলেন, সেই মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট মাওলানা নাঈমুর রহমান বলেন, নজরুলের আচার-আচরণ ও চলাফেরা ভালো ছিল। দেশে থাকতে তাঁর মধ্যে খারাপ কোনো আচরণ দেখেননি তিনি।
শেষবারের মতো ছেলের মুখ দেখতে চান মা
গত সোমবার সকালে নজরুলের বাড়িতে গিয়ে তাঁর বাবা আবদুল বাছিরকে কাঁদতে দেখা যায়। ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে শোকে ভেঙে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠাতে নেওয়া ঋণের বোঝা এখনো পরিবারের ওপর রয়েছে। এর মধ্যে ছেলেকে হারানোর শোক তাঁদের অসহায় করে তুলেছে।
মা রহিমা বেগমের কণ্ঠে এখন শুধু শেষবারের মতো ছেলেকে দেখার আকুতি। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরের পর ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষায় দিন কাটছে বাবা-মায়ের।
তাঁদের চাওয়া, জীবিত ছেলেকে আর ফিরে পাবেন না, অন্তত তাঁর মরদেহ যেন একবার দেখতে পারেন।