ঢাকা, বাংলাদেশ। ছবি: সংগৃহীত
অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা, রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের কাছে নতুন করে ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন চেয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে আইএমএফের কাছে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার এবং বিশ্বব্যাংকের কাছে তিন বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে দুই সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন উপদেষ্টা।
বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অর্থমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থায়ন ব্যবস্থা চায় সরকার। প্রচলিত ঋণশর্তের পরিবর্তে দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নমনীয় শর্তে অর্থায়ন পাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই হতে পারে আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম নতুন ঋণ কর্মসূচি। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলায় নমনীয় অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
অর্থনীতিতে বহুমুখী চাপ
বাংলাদেশ বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি খাতে বাড়তে থাকা ভর্তুকির চাপ এবং কম কর-জিডিপি অনুপাতের মতো সমস্যার মুখোমুখি। সরকারি রাজস্বের তুলনায় ব্যয়ের চাপ বাড়তে থাকায় অর্থায়নের নতুন উৎস খুঁজছে সরকার।
বিশ্বের যেসব দেশে কর-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে কম, বাংলাদেশ তাদের অন্যতম। তিতুমীর আনাদোলুকে বলেন, আগামী পাঁচ বছরে কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থনীতির এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ একটি ‘দেশভিত্তিক সংস্কার কর্মসূচি’ আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কাছে উপস্থাপন করেছে বলেও জানান তিতুমীর। এতে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি খাতের চাপ এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চ্যালেঞ্জগুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
আগের ঋণ কর্মসূচি ছিল ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের
বাংলাদেশের জন্য আইএমএফের আগের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদিত হয়েছিল ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে, শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে। প্রাথমিকভাবে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ওই কর্মসূচির পরিমাণ পরে বাড়িয়ে প্রায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার করা হয়।
এবার নতুন করে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি চেয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি আগামী তিন বছরে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন পাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব দুটি নিয়ে আলোচনা চললেও ঋণ অনুমোদন এবং শর্ত চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।
অর্থনীতি চাঙা করতে ৬০০ বিলিয়ন টাকার উদ্যোগ
ব্যবসা-বাণিজ্যে সহায়তা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করতে ৬০০ বিলিয়ন টাকা বা ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে সরকার। এর লক্ষ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দেওয়া এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরিয়ে আনা।
সরকারের লক্ষ্য, নতুন অর্থায়ন ও সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনা। তবে অর্থনীতির বিদ্যমান চাপ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক ঋণ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে অর্থায়নের শর্ত, সংস্কার বাস্তবায়ন এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার ওপর।