নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পিছিয়ে গেল পিএসজির ম্যাচ
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে চলমান বিক্ষোভ ও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি) ও লিওঁর মধ্যকার ফুটবল ম্যাচ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে ম্যাচ আয়োজনের অনুমতি…
বাংলাদেশ ও নেপালের পর ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে। এসব আন্দোলন ‘জেন-জি বিক্ষোভ’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আবাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে মূলত ১৩ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণেরা এসব আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন। দেশভেদে দাবিদাওয়া আলাদা হলেও এসব বিক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় সেবার অবনতি নিয়ে অসন্তোষ।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আজকের পত্রিকা জানিয়েছে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে শুরু করে এশিয়া ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশেও তরুণদের নেতৃত্বে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্স, ভারত, স্পেন, ইতালি, বেলজিয়াম, পর্তুগাল ও আলবেনিয়ার পাশাপাশি মরক্কো, মাদাগাস্কার ও ইন্দোনেশিয়াতেও এ ধরনের আন্দোলন দেখা যাচ্ছে।
ফ্রান্সে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে বিদ্যালয়গুলোর দুরবস্থার প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়। গত সপ্তাহান্তে দেশটির বিভিন্ন স্থানে এসব কর্মসূচিতে পাঁচ থেকে আট লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের একটি উল্লেখযোগ্য রূপ হয়ে উঠেছে ‘ককরোচ আন্দোলন’। ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্দোলন দমনে এর সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে মোদি সরকার।
স্পেনেও আবাসন সংকট ও জোরপূর্বক উচ্ছেদের ঘটনা নিয়ে অসন্তোষ তীব্র হয়েছে। ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকালকে জোর করে উচ্ছেদের ঘটনা জনমনে ক্ষোভ বাড়িয়ে দেয়। এরপর উচ্ছেদবিরোধী একটি জনপ্রিয় আইন পার্লামেন্টে পাস না হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আগাম নির্বাচনের ডাক দেন। উচ্ছেদের দুই সপ্তাহ পর মারা যান মারিকারমেন।
অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়াচ্ছে তরুণদের ক্ষোভ
বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পর ইউরোপে আয় ও সম্পদের বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে একসময় শক্তিশালী হিসেবে পরিচিত ইউরোপের কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার সক্ষমতাও কমেছে। দীর্ঘদিনের ব্যয়সংকোচন নীতির কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ দুর্বল হয়েছে।
ফলে আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিরা অর্থের বিনিময়ে উন্নত সেবা নিতে পারলেও অনেক সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে তরুণদের ওপর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্থের ঘাটতি, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা হ্রাস এবং মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী মূল্যায়ন কর্মসূচি পিসার সর্বশেষ ফলাফলেও পড়া ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতির প্রবণতাকেও এ অবনতির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
কর্মসংস্থান ও আবাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারও তরুণদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রযুক্তি খাতে পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব মোকাবিলায় সরকারের ধীরগতির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। বিশেষ করে কর্মজীবনের শুরুতে তরুণদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ এখন স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। এতে নতুনদের চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, আবাসন সংকট তরুণদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলছে। আগের প্রজন্মের তুলনায় বর্তমানে অনেক তরুণকে আয়ের বড় অংশ বাড়িভাড়ার পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে সঞ্চয়, পরিবার গঠন ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ কঠিন হয়ে পড়ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু সংকট। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে। বৈষম্যপূর্ণ সমাজে এসব সংকট মোকাবিলার দায়ও অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও পরিবারের ওপর এসে পড়ছে।
বিক্ষোভ দমনে কঠোর হচ্ছে সরকারগুলো
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতা এবং সরকারি সেবার ক্রমাগত অবনতি তরুণদের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভকে বিস্ফোরণমুখী করে তুলেছে। প্যারিস, নয়াদিল্লি, রোম ও মাদ্রিদের রাজপথে সেই অসন্তোষই প্রকাশ পাচ্ছে।
তবে তরুণদের দাবির জবাবে বিভিন্ন সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিক্ষোভবিরোধী আইন, গ্রেপ্তার এবং পুলিশের বলপ্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিবাদ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে। কোথাও এসব পদক্ষেপে আন্দোলন স্তিমিত হচ্ছে, আবার কোথাও তা নতুন করে ক্ষোভ উসকে দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, জেন-জি আন্দোলন শুধু তরুণদের প্রতিবাদ নয়, বরং অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্বল সরকারি সেবা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে বৃহত্তর অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। তরুণদের এই ক্ষোভ মোকাবিলায় কার্যকর সংস্কার ও বাস্তব সমস্যার সমাধান না হলে বিভিন্ন দেশে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au