Please Explain's offensiveness is a feature, not a bug (Image: Crikey/Will McKinnon)
অস্ট্রেলিয়ার ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ওয়ান নেশন পার্টির অনলাইন কার্টুন সিরিজ ‘প্লিজ এক্সপ্লেইন’ ঘিরে বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে। রাজনৈতিক নেতা, অভিবাসী, নারী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ এবং আপত্তিকর উপস্থাপনার অভিযোগ উঠলেও এসব কার্টুনের মাধ্যমে দলটি নিজেদের রাজনৈতিক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সমালোচকদের মতে, বিতর্ক ও ক্ষোভ তৈরি করাই সিরিজটির প্রচারের অন্যতম উদ্দেশ্য।
অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম ক্রিকির এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে সাংবাদিক ক্রিস্টোফার ওয়ারেন লিখেছেন, ওয়ান নেশন পার্টির কার্টুনগুলোকে কেবল রাজনৈতিক শালীনতার সীমা লঙ্ঘনের ঘটনা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝা কঠিন হবে। তাঁর মতে, দলটির রাজনৈতিক প্রচারণায় প্রচলিত শালীনতার সীমা ভেঙে প্রতিপক্ষকে উপহাস করা একটি কৌশল। এ ধরনের কার্টুন নিয়ে সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা তৈরি হলেও দলটি সহজে অবস্থান পরিবর্তন করবে না।
সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সিনেটর জ্যাকি ল্যাম্বির স্বাস্থ্য নিয়ে নারীবিদ্বেষী ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশের পর ব্যাপক সমালোচনা হয়। পরে দলীয় নেতা পলিন হ্যানসন এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি স্বীকার করেন, কার্টুনটি আরও রুচিশীলভাবে উপস্থাপন করা যেত। তবে সিরিজটির নির্মাতা এবং ওয়ান নেশন পার্টির প্রার্থী মার্ক নিকলসন এ বিষয়ে ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানান। বিতর্কিত ওই ভিডিওটি পরে সরিয়ে নেওয়া হয়।
কার্টুন সিরিজটিতে শিশুদের জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও চরিত্র ব্যবহার করেও রাজনৈতিক ব্যঙ্গ করা হচ্ছে। সম্প্রতি দলটির অনুমোদিত শিশুদের রং করার বইয়ে অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘ব্লুই’-এর চরিত্র ব্যবহার করা হয়। সেখানে দেখা যায়, মেলবোর্নের একটি অপরাধপ্রবণ ও খানাখন্দে ভরা সড়কে কুমিরের মতো একটি চরিত্র ছুরির মুখে ব্লুইকে আটকে রেখেছে। পেছনে দাঁড়িয়ে হাসছেন লেবার পার্টির নেতা ও ভিক্টোরিয়া রাজ্যের রাজনীতিবিদ বেন ক্যারল। ছবিতে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের টারবাইনও রাখা হয়েছে।
এ ঘটনায় অস্ট্রেলিয়ার সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এবিসি আইনি পদক্ষেপের হুমকি দেয়। তবে ‘ব্লুই’ চরিত্রটি ওয়ান নেশনের রাজনৈতিক প্রচারণায় এবারই প্রথম ব্যবহার করা হয়নি। এর আগে ২০২৪ সালে ‘দ্য স্টেট অব মেলবোর্ন’ শিরোনামের একটি কার্টুনে চরিত্রটিকে ভিক্টোরিয়ার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ড্যান অ্যান্ড্রুজ এবং প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজকে গাড়িচাপা দিতে দেখা যায়। ওই কার্টুনে প্রধানমন্ত্রীকে ‘ফারি’ সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত একটি চরিত্র হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কার্টুনগুলোতে এবিসি এবং প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের প্রায়ই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখানো হয়। আবার শিশুদের জনপ্রিয় অনুষ্ঠানগুলোর পুরোনো চরিত্র ব্যবহার করে একধরনের স্মৃতিকাতরতা তৈরি করা হচ্ছে। ‘ডিফান্ড দ্য এবিসি’ শিরোনামের একটি পর্বে ‘প্লে স্কুল’-এর পরিচিত চরিত্র জেমিমা ও বিগ টেডকে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের ওপর হামলা করতে দেখা যায়। একই পর্বে ‘ব্যাকইয়ার্ডিগানস’-এর কলা চরিত্রগুলোকেও ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয়।
এ ছাড়া জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতির বিভিন্ন চরিত্র ব্যবহার করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের উপহাস করা হচ্ছে। ধনকুবের ক্লাইভ পামারকে ‘স্টার ওয়ার্স’-এর জাব্বা দ্য হাট চরিত্রের আদলে এবং ভিক্টোরিয়ার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জাসিন্টা অ্যালানকে ‘দ্য উইজার্ড অব অজ’ চলচ্চিত্রের দুষ্ট জাদুকরীর মতো দেখানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজকে অযোগ্য ও বিভ্রান্ত চরিত্র হিসেবে এবং জলবায়ুমন্ত্রী ক্রিস বাওয়েনকে চিনা ব্যাটারি নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক চরিত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ওয়ান নেশন পার্টির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে সিনেটর জ্যাকি ল্যাম্বি এবং অ্যান্ড্রু হ্যাস্টিকেও কার্টুনে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জ্যাকি ল্যাম্বির বিরুদ্ধে দলটির ক্ষোভের একটি কারণ হলো, তিনি পলিন হ্যানসনের মেয়ে লি হ্যানসনকে মায়ের সঙ্গে সিনেটে যোগ দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন।
এ ধরনের রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্রের প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগ রয়েছে। ২০২১ সালে ইউরোপীয় কমিশনের অভিবাসন ও স্বরাষ্ট্রবিষয়ক অধিদপ্তর এক প্রতিবেদনে সতর্ক করেছিল, চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো বিদ্রূপ ও হাস্যরসকে ব্যবহার করে উন্মুক্ত সমাজের মূল্যবোধকে দুর্বল করতে পারে। এর মাধ্যমে উগ্র মতাদর্শকে কৌতুকের আড়ালে উপস্থাপন করা হয়, ফলে সাধারণ ব্যঙ্গ এবং সহিংসতায় উসকানিমূলক বক্তব্যের মধ্যকার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, ‘প্লিজ এক্সপ্লেইন’ সিরিজের নির্মাতা মার্ক নিকলসন অস্ট্রেলিয়ার এবিসি টেলিভিশনের ‘৭.৩০’ অনুষ্ঠানে বলেছেন, তাঁরা দেশের জন্য এবং ব্যঙ্গাত্মক শিল্পের স্বার্থে কাজ করছেন। তবে জ্যাকি ল্যাম্বিকে নিয়ে করা বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাননি তিনি।
ক্রিস্টোফার ওয়ারেনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওয়ান নেশন পার্টির কার্টুনগুলো লাখ লাখবার দেখা হচ্ছে। বিতর্কিত ও আপত্তিকর উপস্থাপনার কারণে তৈরি হওয়া আলোচনাই দলটির রাজনৈতিক প্রচারণাকে আরও ছড়িয়ে দিচ্ছে। তাঁর মতে, কার্টুনগুলোর মাধ্যমে দলটি শুধু প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করছে না, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের সমর্থক ও সম্ভাব্য ভোটারদের কাছে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আবহও তৈরি করছে।