বাংলাদেশ

‘নিজের দেশের মাটিতে মরতে চাই’

এপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকার: ‘যেকোনো মূল্যে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরবেন শেখ হাসিনা’

  • 7:01 pm - November 05, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১১ বার
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা । ছবি: এএফপি ফাইল

মৃত্যুদণ্ডের রায়, গ্রেপ্তার কিংবা কারাবরণের আশঙ্কা থাকলেও দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে অনড় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতের নির্বাসিত জীবন ছেড়ে আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার কথা জানিয়েছেন তিনি। বলেছেন, বিদেশের মাটিতে নয়, নিজের দেশের মানুষের সঙ্গে দেশের মাটিতেই মৃত্যুবরণ করতে চান। এদিকে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, দলটির নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এবং উগ্রপন্থিদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন তিনি। নিজের সরকারের আমলে আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার পরও দেশে ফেরার পরিকল্পনা থেকে সরে আসেননি বলে জানিয়েছেন।

বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) ই-মেইলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেপ্তার, কারাবন্দি, নির্যাতন এমনকি হত্যা করা হতে পারে, সে আশঙ্কাও তাঁর রয়েছে। তারপরও দেশের মানুষের দুর্ভোগ দূর থেকে দেখে বাকি জীবন কাটাতে চান না তিনি।

এপি জানায়, গত সপ্তাহে শেখ হাসিনার কাছে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিল। বুধবার তিনি সেসব প্রশ্নের লিখিত উত্তর দেন।

দেশে ফেরার সিদ্ধান্তের বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “মৃত্যুই যদি আমার নিয়তি হয়, তাহলে আমি নিজের দেশের মাটিতে, নিজের মানুষের মধ্যে মরতে চাই। তাই আমি বাংলাদেশে ফিরব। এ সিদ্ধান্তের কোনো পরিবর্তন হয়নি।”

তবে ভারত থেকে কীভাবে বাংলাদেশে ফিরবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। দেশে ফিরলে তাঁর গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “আমি জানি, দেশে ফিরলে আমাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। কারাগারে পাঠানো হতে পারে, নির্যাতন করা হতে পারে, এমনকি হত্যা করা হতে পারে। এসব সম্ভাবনা সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ সচেতন। কিন্তু দেশের মানুষকে কষ্ট পেতে দেখে দূর থেকে বাকি জীবন কাটাতে পারি না।”

২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা প্রায় ১৫ বছর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে তাঁর সরকারের পতন ঘটে। এরপর তিনি ভারতে চলে যান এবং সেখানেই অবস্থান করছেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।ছবি: সংগৃহীত

২০২৫ সালে বাংলাদেশের একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়ার জন্য তাঁকে দায়ী করেন ট্রাইব্যুনাল। ওই দমন-পীড়নে শত শত মানুষ নিহত এবং হাজারো মানুষ আহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪০০ বলে জানানো হয়েছিল।

তবে শেখ হাসিনা তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ট্রাইব্যুনালের রায় প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর দাবি, এই বিচার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ একাধিকবার ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। তবে ভারত এখন পর্যন্ত তাঁকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়নি। এর মধ্যেই গত আগস্টে শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো ঘোষণা দিয়েছিলেন, ডিসেম্বর মাসে দেশে ফিরতে চান তিনি। এপিকে দেওয়া সর্বশেষ সাক্ষাৎকারেও সেই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

ক্ষমতার পালাবদল ও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা

শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। পরবর্তী ১৮ মাস তিনি দেশের নেতৃত্ব দেন।

এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বড় জয় পেয়ে ক্ষমতায় আসেন তারেক রহমান। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে এবং শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে ওই নির্বাচনে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি।

এদিকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার সময় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মুখে রয়েছে। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন, আবার অনেকে দেশ ছেড়ে নির্বাসনে রয়েছেন।

সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগের অন্তত ২০ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া হাজারো নেতাকর্মী গ্রেপ্তার, নির্যাতন কিংবা আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাঁদের অনেকের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও জীবিকার ওপরও আঘাত এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।ছবিঃ বিবিসি

শেখ হাসিনার ভাষায়, “দেশে স্বাভাবিক রাজনৈতিক বা গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই।” তিনি অভিযোগ করেন, কর্তৃপক্ষ পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে দমিয়ে রাখছে।

তবে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গ্রেপ্তারগুলো নির্দিষ্ট অভিযোগ ও মামলার ভিত্তিতে করা হচ্ছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে আটক করা হচ্ছে না বলে সরকারের অবস্থান।

বিদেশি সহায়তা চান না শেখ হাসিনা

দেশে নিরাপদে ফেরার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মতো দেশগুলো বাংলাদেশের ওপর কোনো চাপ প্রয়োগ করবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি দেশে ফেরার জন্য কোনো বিদেশি শক্তির সুরক্ষা চান না।

তিনি বলেন, “আমি সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিই। এটাই সব সময় আমাদের (বাংলাদেশের) পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ছিল। কিন্তু নিজের দেশে ফিরে যেতে কোনো বিদেশি শক্তির আশীর্বাদ আমার প্রয়োজন নেই।”

শেখ হাসিনার এ বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, দেশে ফেরার বিষয়টিকে তিনি নিজের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। তবে তাঁর প্রত্যাবর্তন কীভাবে সম্ভব হবে, সে বিষয়ে সাক্ষাৎকারে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি।

উগ্রপন্থিদের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উদারপন্থি রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিগুলোকে দমনের চেষ্টা করা উগ্রপন্থি গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বাড়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন তিনি।

এর আগে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও স্বাধীন পর্যবেক্ষক বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশে উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর উত্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এসব গোষ্ঠী উদারপন্থি শক্তির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে বলে অভিযোগ ওঠে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও সে সময় ভয়ভীতি ও হয়রানির মুখে পড়ার অভিযোগ করেছিলেন।

তবে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। অন্যদিকে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগে বর্তমান তারেক রহমান সরকারের সমালোচনা করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়েও বর্তমান সরকার সমালোচনার মুখে রয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ক্ষমতায় থাকার ১৫ বছরে তিনি উগ্রপন্থি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এসব গোষ্ঠী আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে বলে তিনি মনে করেন।

শেখ হাসিনা। ছবিঃ সংগৃহীত

তাঁর ভাষায়, “বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ উগ্রপন্থি গোষ্ঠীগুলোকে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছে।”

এদিকে শেখ হাসিনার এসব অভিযোগ ও বক্তব্যের বিষয়ে মন্তব্য জানতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল এপি। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে শেখ হাসিনা কী পদক্ষেপ নেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। একদিকে তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায়, অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের পর গ্রেপ্তারের আশঙ্কা এবং ভারতের অবস্থান, সব মিলিয়ে তাঁর দেশে ফেরার বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সূত্রঃ এ্যাসোসিয়েট প্রেস

এই শাখার আরও খবর

বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে আওয়ামী লীগ কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা

মুন্সিগঞ্জের সদর উপজেলায় বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে জাহেদ বেপারী (৫০) নামের এক আওয়ামী লীগ কর্মীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। বুধবার (৪ নভেম্বর) রাত…

আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পেলেন পরীমনি

ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের করা মারধর, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মামলায় জামিন পেয়েছেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত শুনানি…

যুবদল নেতার ভয়ে অফিসে যাচ্ছেন না উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সুপ্রভা রাণী

পাবনার সুজানগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুপ্রভা রাণীকে কার্যালয়ে আড়াই ঘণ্টার বেশি সময় অবরুদ্ধ রেখে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা যুবদলের…

অবশেষে সেন্টমার্টিন রুটে জাহাজ চলাচল শুরু, প্রথম দিন গেলেন ৮৩৬ পর্যটক

অবশেষে সব অনুমোদন জটিলতা কাটিয়ে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে শুরু হয়েছে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে ৮৩৬ পর্যটক নিয়ে দ্বীপের উদ্দেশে ছেড়ে যায়…

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ১৫৬তম জন্মবার্ষিকী আজ

আজ ৫ নভেম্বর, উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা, প্রখ্যাত আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও সমাজসংস্কারক দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ১৫৬তম জন্মবার্ষিকী। ১৮৭০ সালের এই দিনে কলকাতায়…

আইনজীবীর পরামর্শে আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন চিত্রনায়িকা পরীমনি

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট :  ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের করা মারধর, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি দেখানোর মামলায় জামিন নিতে আদালতে হাজির হয়েছেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। বুধবার তাঁর জামিন…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au