বিশ্ব

রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাজ্যে ভারতীয় নাবিক আটক, ১০ বছরের কারাদণ্ডের শঙ্কা

  • 11:32 pm - November 06, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৫ বার
রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাজ্যে ভারতীয় নাবিক আটক। ছবিঃ সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে রাশিয়ার তেলবাহী কথিত ‘শ্যাডো ফ্লিটের’ একটি জাহাজ জব্দ করে এর ভারতীয় ক্যাপ্টেনকে গ্রেপ্তার করেছে যুক্তরাজ্য। নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে জাহাজের ক্যাপ্টেন অজয় পান্তের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে তার সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড হতে পারে। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন, নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা এবং নাবিকদের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

রাশিয়ার ওপর আরোপিত পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তার অভিযোগে একটি তেলবাহী জাহাজ জব্দ এবং এর ভারতীয় ক্যাপ্টেনকে আটক করেছে যুক্তরাজ্য। আন্তর্জাতিক জলসীমায় পরিচালিত এ ধরনের প্রথম সামরিক অভিযানের পর জাহাজটির ক্যাপ্টেন অজয় পান্তের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে নাবিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও আইনজীবীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাদের আশঙ্কা, এ ঘটনা সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত নাবিকদের জন্য নতুন ধরনের আইনি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য উত্তরাখণ্ডের বাসিন্দা অজয় পান্তের স্ত্রী রিতু পান্ত জানিয়েছেন, স্বামী সমুদ্রযাত্রায় বের হওয়ার আগে তিনি সব সময় জাহাজের নাম, যাত্রার বিবরণ এবং জরুরি যোগাযোগের তথ্য লিখে রাখতেন। কোনো বিপদ হলে যাতে দ্রুত খোঁজ নেওয়া যায়, সে জন্যই এই সতর্কতা।

গত ২৫ এপ্রিল ওডিশার পারাদ্বীপ বন্দর থেকে অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ এমটি স্মির্টোসে করে যাত্রা শুরু করেন অজয়। ১৮ বছর ধরে বাণিজ্যিক নৌপরিবহনে কর্মরত তিনি বছরে ছয় থেকে সাত মাস সমুদ্রে কাটান। তবে মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জলদস্যুদের তৎপরতা এবং সমুদ্রপথে নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বামীর প্রতিটি যাত্রা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতেন রিতু।

কিন্তু স্বামীর জাহাজ জব্দ হওয়ার খবর তিনি কোনো সরকারি বার্তা বা ফোনকল থেকে পাননি। জুনের মাঝামাঝি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেখে প্রথম জানতে পারেন, জাহাজটি আটক করা হয়েছে। জলদস্যুরা নয়, যুক্তরাজ্যের সশস্ত্র বাহিনী জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা জাহাজটির বিরুদ্ধে অভিযোগ, এটি রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর অংশ হিসেবে কাজ করছিল। এই বহরে থাকা জাহাজগুলো রাশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাস বিক্রি অব্যাহত রাখতে সহায়তা করে বলে পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ।

এখন জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘটনায় যুক্তরাজ্যের রাশিয়াবিষয়ক নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে অজয় পান্তের বিরুদ্ধে মামলা চলছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড হতে পারে। মামলার প্রাথমিক শুনানির পর তার জামিন আবেদনও নাকচ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের (আইটিএফ) যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি টনি প্যাটেন ঘটনাটিকে ব্যতিক্রমী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এ ধরনের ঘটনায় জাহাজের নাবিকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে শাস্তির মুখে ফেলা ন্যায়সংগত নয়।

ইংলিশ চ্যানেলে সামরিক অভিযান

গত ১৪ জুন ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে চলাচলের সময় এমটি স্মির্টোসকে আটক করে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মেরিনস কমান্ডোরা। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের অনুমোদনে পরিচালিত এ অভিযানকে এ ধরনের প্রথম অভিযান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযানের সময় জাহাজটি যুক্তরাজ্যের আঞ্চলিক জলসীমার বাইরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থান করছিল। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নিতে সামরিক অভিযানে অংশ নেয় মেরিটাইম এয়ার গ্রুপের চিনুক, মেরলিন এমকে-৪ ও ওয়াইল্ডক্যাট হেলিকপ্টার, রয়্যাল এয়ার ফোর্সের পি-৮এ পসেইডন মেরিটাইম পেট্রল বিমান, একটি ফ্রিগেট এবং মাইন অপসারণে ব্যবহৃত একটি যুদ্ধজাহাজ।

জাহাজটি রাশিয়া থেকে তেল নিয়ে ভারতের উদ্দেশে যাচ্ছিল। গন্তব্যে পৌঁছাতে এর সুয়েজ খাল অতিক্রম করার কথা ছিল।

অভিযানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, এই সফল অভিযান রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরেকটি আঘাত এবং ইউক্রেনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধকে অর্থায়নকারীদের জন্য সতর্কবার্তা। তারা যেন নিজেদের আড়াল করতে না পারে, তা নিশ্চিত করবে যুক্তরাজ্য।

তবে জাহাজ জব্দের পর ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনার ঘটনাটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আইনজীবীদের মতে, জাহাজের মালিকানা, পতাকা, পণ্য পরিবহন এবং নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের দায় নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনে যে জটিলতা রয়েছে, এ মামলার রায় তা আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবে।

ইউরোপের অন্য দেশগুলোর অবস্থান থেকে ব্যতিক্রম

রাশিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলো মস্কোর ওপর বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এসব নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের ক্ষেত্রে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পদক্ষেপ থাকলেও জাহাজের ক্যাপ্টেনকে আটক করে বিচারের মুখোমুখি করার ঘটনা বিরল।

ইউরোপের কয়েকটি দেশ নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে রাশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রে জাহাজ জব্দ করা হলেও নাবিকদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চলতি বছরের মার্চে রাশিয়ার কথিত শ্যাডো ফ্লিটের একটি জাহাজের ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের আদালতে তার অনুপস্থিতিতে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। অন্যদিকে, ফিনল্যান্ডে রাশিয়ার একটি তেলবাহী জাহাজের ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে বাল্টিক সাগরের তলদেশের যোগাযোগ কেবল ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে এখতিয়ার না থাকার কারণ দেখিয়ে আদালত অভিযোগ খারিজ করে দেন। ইউরোপের অন্য কিছু দেশেও বাণিজ্যিক জাহাজের নাবিকদের জরিমানা দিয়ে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

সেই তুলনায় অজয় পান্তের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রেখে মামলা করাকে ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখছেন সমুদ্র আইন ও নাবিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা।

মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাট সি-এর প্রতিষ্ঠাতা ও আইনজীবী ডেভিড হ্যামন্ড বলেন, স্মির্টোসের ঘটনাটি বেশ ব্যতিক্রমী। আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের পথ হিসেবে ব্যবহৃত ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করার সময় নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত একটি জাহাজকে আটক করার ঘটনা তার জানা মতে আগে ঘটেনি।

তার মতে, এ মামলার রায় নির্ধারণ করতে পারে উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো ভবিষ্যতে কীভাবে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে এটি সমুদ্রপথে কর্মরত নাবিকদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা বা ‘ক্রিমিনালাইজেশন’ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করছে।

হ্যামন্ড বলেন, অনেক সময় জাহাজে কী পণ্য তোলা হয়েছে, তা নাবিকদের জানা থাকে না। অথচ মাদক পাচার বা অবৈধ পণ্য পরিবহনের অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি ২০২৩ সালে তুরস্কে আটক ফিনিশ-সিরীয় জাহাজের প্রধান কর্মকর্তা আলি আলবুখারির উদাহরণ দেন। ওই জাহাজে ১৩৭ কেজি কোকেন পাওয়ার পর তাকে আটক করা হয়েছিল।

আইটিএফের টনি প্যাটেনও বলেন, কোনো ঘটনা ঘটলেই নাবিকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে শাস্তির মুখে ফেলা ন্যায্য নয়। নাবিকদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি সংগঠনটির কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

হ্যামন্ডের মতে, অজয় পান্তের ক্ষেত্রে এমন যুক্তিও উঠতে পারে যে তিনি কেবল নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালন করার কারণেই ফৌজদারি বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। ব্রিটিশ আদালতের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞাভুক্ত পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে জাহাজের ক্যাপ্টেনের দায় কতটুকু, তা নির্ধারণে নতুন নজির তৈরি করতে পারে।

তিনি পুরো পরিস্থিতিকে বিশ্বজুড়ে দায়মুক্তির সংকটের মধ্যে তৈরি হওয়া একটি ‘পারফেক্ট স্টর্ম’ বা একাধিক সংকটের সম্মিলিত অভিঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এ ঘটনায় মূল প্রশ্ন হলো, দায় কার এবং সেই দায় কার্যকর করার ক্ষমতা কার হাতে থাকবে। এর অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি কী হতে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

যুদ্ধ ও জলদস্যুতায় সমুদ্রে বাড়ছে নাবিকদের ঝুঁকি

সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে অজয় পান্তের আটকের ঘটনা সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর হরমুজ প্রণালিতে অন্তত ২৪ জন নাবিক নিহত হয়েছেন। এ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে ১২০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। ফলে এ অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা ও জাহাজে হামলা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি নাবিকদের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

কৃষ্ণসাগরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সেখানে জাহাজে ৫৭০টির বেশি হামলায় অন্তত ৪০ জন নাবিক নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া সোমালিয়ার উপকূলে জলদস্যুদের তৎপরতাও আবার বাড়তে শুরু করেছে।

রিতু পান্ত বলেন, স্বামী সমুদ্রে থাকাকালে তিনি প্রায়ই তাকে ফোনে যোগাযোগ রাখার অনুরোধ করতেন। আশপাশের পরিস্থিতি নিরাপদ কি না, তা জানাতে বলতেন। কারণ সমুদ্রে তখন পরিস্থিতি খুব খারাপ ছিল বলে তিনি মনে করতেন।

তবে সমুদ্রপথে নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে অনেক সময় কয়েক দিন স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হতো না। সে কারণে জাহাজের অবস্থান ও গতিবিধি অনলাইনে অনুসরণ করতেন তিনি। সমুদ্রে কর্মরত নাবিকদের পরিবারের মধ্যে এ ধরনের নজরদারি এখন ক্রমেই সাধারণ অভ্যাস হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, চলতি বছর বিভিন্ন সংঘাতে অন্তত ৬৬ জন নাবিক নিহত হয়েছেন এবং কয়েক শ আহত হয়েছেন। অনেক নাবিক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মৃত বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

টনি প্যাটেন বলেন, সমুদ্রে কর্মরত মানুষের জন্য এটি ভয়াবহ একটি বছর। আগে থেকেই নানা সমস্যা ছিল, তবে সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

হ্যামন্ডের মতে, জাহাজ পরিচালনাকারী কোম্পানি ও বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষ অনেক সময় নাবিকদের সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য কর্মী হিসেবে বিবেচনা করে। অথচ বিশ্ব অর্থনীতির পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সচল রাখতে তাদের ভূমিকা অপরিহার্য। এই দ্বৈত অবস্থানের কারণে নাবিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আইনি প্রশ্ন

স্মির্টোসের ঘটনাটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় সামরিক বাহিনীর অভিযান চালিয়ে জাহাজ জব্দ করার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য দাবি করছে, আন্তর্জাতিক আইনের আওতার মধ্যেই তারা এসব অভিযান পরিচালনা করছে।

সমুদ্র আইনবিষয়ক জাতিসংঘের কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো জাহাজের রাষ্ট্রীয় নিবন্ধন বা জাতীয়তা নিয়ে যুক্তিসংগত সন্দেহ থাকলে যুদ্ধজাহাজ সেটির পতাকা ও পরিচয় যাচাইয়ের জন্য তল্লাশি চালাতে পারে।

স্মির্টোস জব্দের পর ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, কোনো জাহাজ রাষ্ট্রহীন বলে নির্ধারিত হলে যুক্তরাজ্য তার নিজস্ব পুলিশিং অ্যান্ড ক্রাইম আইনের আওতায় ফৌজদারি ও সামুদ্রিক আইন প্রয়োগের ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে।

স্মির্টোসের মতো রাশিয়ার শ্যাডো ফ্লিটের অন্তর্ভুক্ত বলে অভিযুক্ত অনেক জাহাজই বিভিন্ন সময়ে নিজেদের পতাকা পরিবর্তন করেছে। একসময় জাহাজটি গাম্বিয়ার নিবন্ধনে ছিল। পরে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ক্যামেরুনের পতাকা গ্রহণ করে। রাশিয়ার বন্দর থেকে যাত্রার সময়ও জাহাজটিতে ক্যামেরুনের পতাকা ছিল। তবে সামুদ্রিক তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর আগেই জুন মাসে জাহাজটিকে ক্যামেরুনের নিবন্ধন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। জাহাজটির মালিক একটি চীনা প্রতিষ্ঠান।

ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, রাশিয়া তার মোট তেলের প্রায় ৭৫ শতাংশ এ ধরনের শ্যাডো ট্যাংকার ব্যবহার করে বিক্রি করে।

তবে কোনো দেশের নিজস্ব নিষেধাজ্ঞা ও আইন আন্তর্জাতিক জলসীমায় অন্য দেশের নাগরিক বা নিজস্ব ভূখণ্ডে নিবন্ধিত নয় এমন জাহাজের ওপর প্রয়োগ করার অধিকার কতটুকু, তা আন্তর্জাতিক আইনে এখনো বিতর্কিত। জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই আরোপিত একতরফা নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক জলসীমায় কীভাবে কার্যকর করা যাবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

হ্যামন্ডের মতে, এ ধরনের জাহাজ জব্দের ঘটনা সমুদ্রে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার মতো আরও বড় একটি বিষয় সামনে নিয়ে এসেছে। তার আশঙ্কা, এ ধরনের অভিযান স্বাভাবিক বাণিজ্যিক নৌ-চলাচলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

স্বামীর মুক্তির অপেক্ষায় রিতু, নজিরবিহীন মামলার দিকে তাকিয়ে নাবিক সমাজ

অজয় পান্তের আটকের পর তার স্ত্রী রিতু এখন শুধু স্বামীর মুক্তির জন্য লড়ছেন না, বরং বিশ্বজুড়ে নাবিকদের অধিকার রক্ষার দাবিও তুলে ধরছেন। তার মতে, এ মামলার গুরুত্ব কেবল একটি পরিবারের সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর রায় বিশ্বের নাবিকদের ভবিষ্যতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

রিতু বলেন, ‘অজয়ের ঘটনা শুধু আমাদের পরিবারের বিষয় নয়। এটি বিশ্বজুড়ে নাবিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে। কোনো জাহাজের ক্যাপ্টেনকে কি এমন সিদ্ধান্তের জন্য অপরাধী করা যায়, যা তার ক্ষমতা, জ্ঞান বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে?’

তিনি জানান, অজয় পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী ছিলেন। স্বামীর মামলা পরিচালনা ও মুক্তির প্রচেষ্টায় সময় দিতে গিয়ে তাকেও নিজের কাজ ছেড়ে দিতে হয়েছে। তাদের আট বছর ও এক বছর বয়সী দুটি সন্তান রয়েছে। অজয় তার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনার দায়িত্বও পালন করতেন।

ঋতু পন্ত তাঁর স্বামী অজয়ের টুপি পরে আছেন; অজয় তখন যে জাহাজের দায়িত্বে ছিলেন, সেখানে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় ছবিটি তোলা হয়েছিল। [সৌজন্যে: ঋতু পন্ত]

স্বামী গ্রেপ্তারের পর প্রথম কয়েক দিন পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের বিষয়টি জানাননি রিতু। তাদের শারীরিক অবস্থার কথা ভেবে বাড়িতে দৈনিক পত্রিকা আসাও বন্ধ করে দেন। বড় মেয়েকেও কিছুদিন স্কুলে পাঠাননি, যাতে কেউ তাকে বাবার বিষয়ে কষ্টদায়ক কিছু না বলে।

পরে পরিবারের সদস্যদের সবকিছু জানান এবং সামনে দীর্ঘ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করেন। তবে সবচেয়ে কঠিন বিষয় হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ভিন্ন মহাদেশে অবস্থান করে স্বামীর মুক্তির জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়া।

রিতু বলেন, স্বামীর সঙ্গে এখন শুধু অল্প সময়ের ফোনালাপ হয়। গত আগস্টে তিনি যুক্তরাজ্যে গিয়ে স্বামীর সঙ্গে দেখা করার পর আর কেউ ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। তিনি চান না, অজয় মনে করুন যে পরিবার তাকে ভুলে গেছে।

তবে আন্তর্জাতিক নাবিক সমাজের সমর্থন তাকে আশাবাদী করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বামীর মুক্তির পক্ষে প্রচার শুরু করার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাবিকদের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাদের অনেকেই একই ধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।

রিতুর অভিযোগ, সংঘাতপূর্ণ সমুদ্রপথে কর্মরত অনেক নাবিককে এখন লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন ঘটনায় তাদের বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে।

স্বামীর আসন্ন বিচারকে সামনে রেখে তিনি বলেন, ‘আমাকে তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনতেই হবে। তার পরিবারের জন্য, কিন্তু একই সঙ্গে এ কারণেও যে কোনো নাবিকের সঙ্গে এমন আচরণ করা উচিত নয়।’

অজয় পান্তের মামলার রায় তাই শুধু একজন ভারতীয় নাবিকের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজের ক্যাপ্টেনদের আইনি দায়, রাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের ক্ষমতা এবং নাবিকদের সুরক্ষা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেবে।

সূত্রঃ আল জাজিরা

এই শাখার আরও খবর

ছিনতাইকারী ভেবে দুই পুলিশ সদস্যকে পেটালেন কুবি শিক্ষার্থীরা

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  ছিনতাইকারী সন্দেহে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষার্থীরা দুই পুলিশ সদস্য ও পুলিশের এক সোর্সকে মারধর করে বাসে তুলে ক্যাম্পাসে নিয়ে গেছেন। পরে…

বিচ্ছেদের জল্পনায় জল! দীপাবলির পার্টিতে হাতে হাত রেখে হাজির অভিষেক-ঐশ্বরিয়া

দীর্ঘদিন ধরেই তাঁদের দাম্পত্য জীবন নিয়ে নানা জল্পনা বলিউডে। কখনও বিচ্ছেদের গুঞ্জন, কখনও পারিবারিক দূরত্বের খবর। তবে সব জল্পনাকে পিছনে ফেলে আবারও একসঙ্গে দেখা গেল…

যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ধস, এক দিনেই উধাও আড়াই লাখ কোটি ডলার

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের জয়ের পর দেশটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর জেরে গতকাল বৃহস্পতিবার বড়…

৩২ কেজির ‘কামানের গোলা’ নিয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাগ্‌যুদ্ধ, বেইজিংয়ের দাবি মদের বোতল

পাপুয়া নিউগিনিতে (পিএনজি) উদ্ধার হওয়া ৩২ কেজি ওজনের একটি সন্দেহজনক বস্তু ঘিরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হয়েছে কূটনৈতিক বাগ্‌যুদ্ধ। চীনের তৈরি বলে ধারণা করা…

শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে বাংলাদেশে ফের ক্ষমতার পালাবদলের আশঙ্কা কতটা?

বাংলাদেশে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশে আবারও রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে নর্থইস্ট নিউজের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।…

নেতানিয়াহুর জোটে ভাঙন, রোববার সরকার গঠনের দায়িত্ব পেতে পারেন আইজেনকোট

ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গঠনের জন্য রোববারের মধ্যে একজন প্রার্থীকে দায়িত্ব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পরিবর্তে বিরোধী নেতা ও সাবেক…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au