ইসরায়েলের নির্বিচার বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিধ্বস্ত গাজা। ছবি: রয়টার্স
মেলবোর্ন, ৫ জুলাই-
ইরানে হামলা শেষে ফেরার পথে গাজায় অব্যবহৃত বোমা ফেলে তীব্র হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। শুরুতে এটি তাৎক্ষণিক কৌশল হিসেবে নেওয়া হলেও পরে তা পরিকল্পিত নিয়মিত হামলায় পরিণত হয়। ফলে ইরান অভিযানের সময়ও গাজায় হামলার মাত্রা কমেনি, বরং বেড়েছে। ১৩ থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত সময়ে শতাধিক বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে গাজায়।
সামরিক সূত্র জানিয়েছে, ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ নামে ইরান অভিযানের প্রথম দিন থেকেই ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের পাইলটরা ফেরার পথে গাজায় হামাসকে লক্ষ্য করে অবশিষ্ট গোলাবারুদ ফেলার প্রস্তাব দেন। আইডিএফের গ্রাউন্ড কমান্ডাররা সেই প্রস্তাব অনুমোদন করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু ঠিক করে দেন। পরে এই কৌশল পুরো যুদ্ধের সময় আরও বিস্তৃতভাবে ব্যবহার করা হয়।
ওই সময় গাজায় একের পর এক হামলায় বহু মানুষ নিহত হন। ১৮ জুন মাগাজি শরণার্থী শিবিরে এক বিমান হামলায় নারী ও শিশুসহ ১০ জন নিহত হন, একই দিনে খান ইউনিসের আরেকটি হামলায় প্রাণ যায় আরও পাঁচজনের। ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল তোমের বার অবশিষ্ট অস্ত্র ব্যবহারের এই কৌশল অনুমোদন দেন এবং পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানোর নির্দেশ দেন।
ইরানে ইসরায়েলের অভিযানে মূল লক্ষ্য ছিল পারমাণবিক কর্মসূচির স্থাপনা ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করা, যাতে ইরান থেকে ইসরায়েলে হামলার ঝুঁকি কমানো যায়।
এদিকে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গাজা যুদ্ধ থামাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির নতুন প্রস্তাব এসেছে। আলোচনায় রয়েছে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা আংশিকভাবে প্রত্যাহার, সব জিম্মির মুক্তি এবং যুদ্ধের স্থায়ী অবসান। মিসরের সংবাদমাধ্যম ‘আল-রাদ’ জানিয়েছে, এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র গ্যারান্টি দেবে এবং আলোচনায় থাকবে যুদ্ধপরবর্তী শাসনব্যবস্থা, জিম্মিমুক্তি ও যুদ্ধবিরতি।
হামাস বলছে, কোনো জিম্মিমুক্তির চুক্তির সঙ্গেই গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার ও যুদ্ধের স্থায়ী অবসান নিশ্চিত করতে হবে। আগের প্রস্তাবগুলোতে এ নিশ্চয়তা না থাকায় তা প্রত্যাখ্যান করেছিল হামাস। তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রথমবারের মতো নমনীয় মনোভাব দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, হামাসকে ধ্বংসের চেয়ে জিম্মিদের ফেরত আনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নেতানিয়াহুর উপদেষ্টা রন ডার্মার ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। নেতানিয়াহু শিগগিরই ওয়াশিংটন যাচ্ছেন, যেখানে নীতিগত কোনো ঘোষণা আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কাতার হামাসকে ব্যক্তিগত অস্ত্র সমর্পণের নির্দেশ দিয়েছে, যা ইসলামপন্থি সংগঠনটির জন্য অপমানজনক হলেও অনেকে এটিকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন।
এখনো হামাসের হাতে প্রায় ২০ থেকে ২২ জন জীবিত জিম্মি ও অন্তত ২৮ জনের মৃতদেহ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুদ্ধের অবসান দেখতে চায় ইসরায়েলি জনগণও, আর আন্তর্জাতিকভাবে এই যুদ্ধ থামাতে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে।
২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে আক্রমণের পর থেকে এই সংঘাতের শুরু হয়েছিল। হামাসের ওই হামলায় প্রায় ১২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়।
এর প্রতিশোধ নিতে গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় ইসরায়েল। সেখানে মানবিক সংকট এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে।
হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান চলাকালে ৪৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং গাজার অধিকাংশ অবকাঠামো বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে।
তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, তারা হামাসের যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছে এবং বেসামরিক মানুষদের হতাহতের ঘটনা এড়ানোর চেষ্টা করেছে।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ