মেলবোর্ন, ১৬ জুন- চীনের ইস্পাত শিল্পে দীর্ঘস্থায়ী মন্দার প্রভাব যখন বৈশ্বিক কাঁচামাল বাজারে চাপ সৃষ্টি করছে, তখন ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল ইস্পাত শিল্পকে নতুন ভরসা হিসেবে দেখছে অস্ট্রেলিয়ার খনি কোম্পানিগুলো। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এই অঞ্চলগুলোর ক্রমবর্ধমান চাহিদা চীনের বাজারে মন্দার ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে দিতে পারে।
সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক খনিজ ও ইস্পাত শিল্প সম্মেলনে অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ খনি কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা বলেন, বিশ্বের বৃহত্তম ইস্পাত উৎপাদক দেশ চীনে চাহিদা কমে যাওয়ায় লৌহ আকরিক ও ধাতব কয়লার বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। তবে ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কারণে সেখানে ইস্পাতের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইস্পাত উৎপাদক দেশ ভারত বর্তমানে বছরে প্রায় ১৬ কোটি ৮০ লাখ টন ইস্পাত উৎপাদন করে। দেশটির সরকার ২০৩৫-৩৬ সালের মধ্যে উৎপাদন বাড়িয়ে ৪০ কোটি টনে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিপুল পরিমাণ লৌহ আকরিক ও ধাতব কয়লার প্রয়োজন হবে, যার বড় অংশই আমদানির মাধ্যমে সংগ্রহ করতে হবে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খনি প্রতিষ্ঠান BHP Group-এর গ্রুপ বিক্রয় ও বিপণন কর্মকর্তা মিশিয়েল হোভার্স বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে ধাতব কয়লার চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। তার মতে, দক্ষিণ এশিয়া আগামী কয়েক দশকে বিশ্ব ইস্পাত শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
একই ধরনের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন Rio Tinto-এর প্রধান বাণিজ্য কর্মকর্তা বোল্ড বাতার। তিনি বলেন, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে ইস্পাতের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে, যা চীনের বাজারে মন্দার নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে।
অন্যদিকে, চীনের আবাসন ও নির্মাণ খাতের সংকট এখন টানা পঞ্চম বছরে প্রবেশ করেছে। এক সময় দেশটির ইস্পাত ব্যবহারের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি ছিল এই খাত। কিন্তু নির্মাণ কর্মকাণ্ডে ধীরগতির কারণে ইস্পাতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর ফলে ২০২৫ সালে চীনের ইস্পাত উৎপাদন সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।
এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার খনি কোম্পানিগুলো চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কাঁচামাল ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান China Mineral Resources Group-এর বাড়তি চাপেরও মুখে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটি তুলনামূলক কম দামে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আরও সুবিধাজনক শর্ত আদায়ের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চলতি বছরও চীনের ইস্পাত বাজারে বড় ধরনের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা কম। সিঙ্গাপুর সম্মেলনে চীনের একটি শিল্প সংগঠনের উপমহাসচিব ঝিনকুই ঝাওও সতর্ক করে বলেন, এ বছর দেশটিতে ইস্পাতের চাহিদা আরও কমতে পারে।
তবে সামগ্রিকভাবে শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অবকাঠামো উন্নয়ন, নগরায়ণ এবং শিল্পায়নের গতি অস্ট্রেলিয়ার খনি খাতের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। চীনের বাজারে অনিশ্চয়তা থাকলেও এই উদীয়মান অঞ্চলগুলো ভবিষ্যতে বৈশ্বিক লৌহ আকরিক ও ধাতব কয়লার প্রধান ক্রেতায় পরিণত হতে পারে।