বিশ্ব

বিশ্ব রাজনীতিতে ট্রাম্পের ‘ম্যাডম্যান তত্ত্ব’: অপ্রত্যাশিত কৌশল না আত্মঘাতী পথ?

  • 6:27 am - July 07, 2025
  • পঠিত হয়েছে:২৬১ বার
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৭ জুলাই-

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও আসন্ন নির্বাচনেও রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই তার অপ্রথাগত রাজনৈতিক কৌশল ও আচরণের জন্য আলোচিত। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং বিতর্কিত বিষয় হচ্ছে ‘ম্যাডম্যান থিওরি’ বা ‘খ্যাপাটে তত্ত্ব’। এ তত্ত্বের মাধ্যমে ট্রাম্প বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থানকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন তিনি যে কোনো সময়, যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—যা বন্ধু, শত্রু উভয়ের জন্যই অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

এই তত্ত্বের উৎপত্তি ষাটের দশকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের শাসনামলে। নিক্সন শত্রু পক্ষকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, তিনি এতটাই অনিশ্চিত ও “পাগলাটে” যে, তারা যেন ভয় পায় ও সমঝোতায় রাজি হয়। ট্রাম্প সেই তত্ত্বকে নতুনভাবে নিজের কৌশলের অংশ করেছেন।

ট্রাম্পের সময় দেখা গেছে, কখনো হঠাৎ করে ইরান বা উত্তর কোরিয়ার মতো দেশের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার হুমকি, আবার পরদিনই আলোচনায় বসার আগ্রহ দেখানো। একদিকে শুল্ক আরোপের ভয় দেখানো, অন্যদিকে “সেরা চুক্তি”র প্রতিশ্রুতি। এভাবে শত্রু পক্ষ যেন নিশ্চিত হতে না পারে, ট্রাম্প আসলে কী করতে যাচ্ছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অনিশ্চয়তাই ট্রাম্পের প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করে। কারণ, একবার প্রতিপক্ষ ভেবে বসে, তিনি সত্যিই আগ্রাসী বা “অপ্রত্যাশিত” হতে পারেন, তখন তারা আলোচনায় রাজি হতে কিংবা ছাড় দিতে বাধ্য হয়। এটি এক ধরনের মানসিক চাপের কৌশল, যেখানে প্রতিপক্ষ টেবিলে বসার আগেই কিছুটা পিছু হটে।

তবে শুধু প্রতিপক্ষই নয়, মিত্রদের ক্ষেত্রেও এই তত্ত্ব প্রযোজ্য হয়ে পড়েছে। ট্রাম্প বারবার ন্যাটো ও অন্যান্য জোটের দেশগুলোকে বলেছেন, যদি তারা প্রতিরক্ষা ব্যয় না বাড়ায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো সহায়তা করবে না। এর ফলে ইউরোপের অনেক দেশ নিজেদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়েছে, যাতে ট্রাম্পের অনিশ্চিত অবস্থান থেকে নিজেদের রক্ষা করা যায়।

উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ব্রিটেন সরকার ইতিমধ্যেই প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির ২.৩ থেকে ২.৫ শতাংশ করেছে এবং ভবিষ্যতে তা ৫ শতাংশ পর্যন্ত নেয়ার পরিকল্পনা করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি এক অর্থে ট্রাম্পের চাপের ফল। আবার ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুত্তে ট্রাম্পকে ‘ডিয়ার ডোনাল্ড’ বলে সরাসরি প্রশংসা জানিয়েছেন, যাতে তার সমর্থন ধরে রাখা যায়।

কিন্তু এই তত্ত্ব নিয়ে তীব্র বিতর্কও রয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, এভাবে নেতৃত্বে অপ্রত্যাশিত আচরণ শুধু শত্রু নয়, বন্ধুদেরও আতঙ্কিত ও বিভ্রান্ত করে। দীর্ঘমেয়াদে এতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর মিত্রদের আস্থা কমে যায় এবং ঐক্য দুর্বল হতে থাকে। নীতির স্থিরতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা কমে গেলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্বের ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘ম্যাডম্যান থিওরি’ একপ্রকার হুমকি ও তোষণের মিশ্র কৌশল। এতে মিত্ররা ট্রাম্পকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে, যেমন তোষামোদমূলক বার্তা বা নীতিগত ছাড় দেয়। আর প্রতিপক্ষের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়, যাতে তারা চুক্তি করতে রাজি হয়। কিন্তু সমস্যা হয়, যখন সবাই বুঝে ফেলে, এই “পাগলামো” কৌশল— আসলে পরিকল্পিত, তখন এর কার্যকারিতা কমতে থাকে।

এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে, ট্রাম্প যদি আবার প্রেসিডেন্ট হন, তাহলে এই ‘ম্যাডম্যান থিওরি’ দিয়ে তিনি কাকে কী বার্তা দিতে চাইবেন? আবার, এই কৌশল কতটুকু সফল হবে, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অবস্থান ও নেতৃত্ব আরও দুর্বল করবে—তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিশেষজ্ঞ মহলে আলোচনা তুঙ্গে।

ট্রাম্পের এই নীতি একদিকে সমালোচিত, অন্যদিকে অনেকের কাছে তা বাস্তব রাজনীতির এক নিপুণ হাতিয়ার। ফলে ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ভূমিকা যে আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে, তা অনেকটাই নিশ্চিত। বিশ্ব এখন সেই অনিশ্চয়তার দিকেই তাকিয়ে আছে, বুঝতে চেষ্টা করছে— ট্রাম্প আসলেই “পাগল” নাকি অত্যন্ত হিসাবি এক কৌশলী খেলোয়াড়।

এই শাখার আরও খবর

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপের দেশগুলো সরিয়ে নিচ্ছে সোনার মজুদ

চলতি সপ্তাহে উত্তর আমেরিকা থেকে ৮৬ টন সোনা সরিয়ে লন্ডনের ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে স্থানান্তর করেছে নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে গুরুতর কোনো সংকট…

ফেসবুক মার্কেটপ্লেসে চেয়ার কিনতে গিয়ে তৃতীয় ব্যক্তির ছুরিকাঘাতে আহত

অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ফেসবুক মার্কেটপ্লেসের মাধ্যমে চেয়ার কেনার পর এক ব্যক্তি আকস্মিক ছুরিকাঘাতের শিকার হয়েছেন। এ ঘটনায় হামলাকারীকে এখনও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে,…

কুঠার দিয়ে হামলার অভিযোগ, গুরুতর আহত তিনজনকে হাসপাতালে

অস্ট্রেলিয়ার গিপসল্যান্ডের টাইয়ার্স শহরে একটি বাড়িতে কুঠার দিয়ে হামলার অভিযোগ উঠেছে। এতে এক বৃদ্ধসহ তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজন পুরুষকে জীবন সংকটাপন্ন অবস্থায়…

কবর থেকে পীর শামীমের দেহাবশেষ তুলে দরবারে, ফের গোরস্থানে দাফনের সিদ্ধান্ত

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে আলোচিত পীর শামীম জাহাঙ্গীরের দেহাবশেষ কবর থেকে তুলে তার দরবার প্রাঙ্গণে নিয়ে পুনরায় দাফনের অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে ফিলিপনগর এলাকার…

পার্বত্য চট্টগ্রামে কি ভারতকে হারানোর কৌশল নিয়েছিল পাকিস্তান?

১৯৯৭ সালের ডিসেম্বর। কোনো গুলি ছোড়া ছাড়াই ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক সাফল্য অর্জিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি…

মহাসাধক ​বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী: অলৌকিক সাধনা ও বিপন্ন মানুষের পরম আশ্রয়

​সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস ও চেতনার দিগন্তে এক ধ্রুবতারার নাম লোকনাথ ব্রহ্মচারী। আধ্যাত্মিকতার এমন এক উচ্চ শিখরে তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন, যেখানে অসীম করুণা আর অলৌকিক শক্তির…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au