টেক্সাসের হান্টে গুয়াদালুপ নদীর তীরে ক্যাম্প মিস্টিকের জিনিসপত্র দেখছেন লোকজন। আকস্মিক বন্যার পর এই এলাকাটি ভেসে গেছে। ছবিঃ এপি
মেলবোর্ন, ৭ জুলাই-
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্ব টেক্সাসে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ৮২ জনে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৪১ জন। স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত থেকে শুরু হওয়া প্রবল বৃষ্টিপাত ও হঠাৎ সৃষ্ট বন্যা বিশাল এলাকাজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। খবর দিয়েছে আল জাজিরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় টেক্সাসের গুয়ার্ডিয়াড্পলে নদীতে পানি হঠাৎ বেড়ে গিয়ে বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ে আশেপাশের এলাকায়। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি খ্রিস্টান গ্রীষ্মকালীন শিবির—ক্যাম্প মিস্টিক। এখানে থাকা প্রায় ৭০০ জনের মধ্যে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৮ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ২৮ জনই শিশু। এখনও শিবিরের অন্তত ১০ জন কিশোরী ও একজন কাউন্সেলরের কোনো খোঁজ মেলেনি।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ক্যাম্প মিস্টিক প্রায় পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। বন্যার পানির প্রচণ্ড তোড়ে কেবিন ও অন্যান্য স্থাপনা ভেসে যায়। শিবিরের বেঁচে যাওয়া অনেকেই জানিয়েছেন, তারা শেষ মুহূর্তে প্রাণপণে দৌড়ে ও গাছে উঠে কোনোরকমে প্রাণ রক্ষা করেছেন।
এদিকে উদ্ধার তৎপরতা এখনো অব্যাহত আছে। উদ্ধারকর্মীরা হেলিকপ্টার, নৌকা ও বিশেষ ড্রোনের সাহায্যে নিখোঁজদের সন্ধান করছেন। টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট রাজ্যে ‘প্রার্থনার দিন’ ঘোষণা করেছেন এবং উদ্ধারকর্মীদের ২৪ ঘণ্টা কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফেডারেল পর্যায়ে জরুরি সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ পর্যাপ্ত সতর্কবার্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। অনেকেই সময়মতো কোনো বার্তা পাননি, যার ফলে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেড়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
টেক্সাসে এখনও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, সামনে আবারো ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। মাটি আগের বৃষ্টিতে ইতোমধ্যে সম্পৃক্ত থাকায় নতুন বৃষ্টি আরও বড় ধরনের বন্যা তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে তারা।
মারাত্মক এই বিপর্যয়ে নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক মহল। উদ্ধারকাজ এবং নিখোঁজদের সন্ধান এখনো জোরদারভাবে চলেছে। পুরো টেক্সাসজুড়ে আতঙ্ক আর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
টেক্সাসের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ভারী বৃষ্টি হচ্ছিল। শুক্রবার রাতে সেই বৃষ্টি আচমকা তীব্র হয়ে ওঠে এবং কেন্দ্রীয় টেক্সাসের গুয়ার্ডিয়াড্পলে নদীর পানি হঠাৎ বেড়ে যায়। রাতের আঁধারে নদীতে সৃষ্টি হয় এক ধরনের ‘ওয়াল অব ওয়াটার’ বা পানির প্রাচীর, যা প্রবল বেগে আশপাশের এলাকা, বিশেষ করে পাহাড়ি এবং নিম্নভূমিতে আছড়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মূল কারণ কয়েক দিনের ভারী বর্ষণের ফলে নদীর পানি ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যাওয়া। সেই সঙ্গে টেক্সাসের পাহাড়ি অঞ্চলে যখন একসাথে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টি নামে, তখন ঢলের পানি খুব দ্রুত নেমে আসে। ফলে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় লিয়োঙ্গাথা অঞ্চলের ক্যাম্প মিস্টিক নামের গ্রীষ্মকালীন খ্রিস্টান শিবিরটি, যেখানে শত শত শিশু ও তরুণ-তরুণী গ্রীষ্মকালীন ছুটি কাটাচ্ছিল। গভীর রাতে হঠাৎ প্রবল স্রোতের ঢেউ ক্যাম্পের ভেতর ঢুকে পড়ে। অনেকেই তখন ঘুমাচ্ছিল, কেউ কেউ বাইরে খোলা মাঠে ছিল—যার ফলে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে কেবিন ও অন্যান্য স্থাপনা, আর মানুষ পানির তোড়ে ভেসে যায়।
স্থানীয় সময়মতো পর্যাপ্ত সতর্কবার্তা পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ করেছেন অনেকেই। বিশেষ করে কের কাউন্টির কিছু এলাকায় জরুরি সাইরেন বা মোবাইল সতর্কবার্তা সময়মতো যায়নি, যার ফলে মানুষ প্রস্তুতি নিতে পারেনি।
টেক্সাসের এই অঞ্চলে বর্ষাকালে হঠাৎ করে এমন ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যা নতুন নয়, তবে এবারের বন্যা আগের চেয়ে বেশি প্রাণঘাতী হয়েছে। এর পেছনে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, নদীর তীরে অপরিকল্পিত নির্মাণ আর সতর্কতামূলক ব্যবস্থার ঘাটতিও দায়ী বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অসম প্রস্তুতি আর অবকাঠামোর দুর্বলতার কারণে রাতারাতি এক ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসে টেক্সাসের মানুষের জীবনে।
সুত্রঃ আল জাজিরা