প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি, ভারতে টেলিগ্রাম নিষিদ্ধ
মেলবোর্ন, ১৭ জুন- ভারতের জাতীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁস ও প্রতারণার অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশটিতে প্রথমবারের মতো জনপ্রিয় মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম টেলিগ্রাম সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ…
মেলবোর্ন, ১১ জুলাই-
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়েছেন। নোবেল কমিটির কাছে পাঠানো এক চিঠিতে নেতানিয়াহু উল্লেখ করেছেন, ট্রাম্প বিশ্বব্যাপী শান্তি, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ব্যতিক্রমধর্মী ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। এই মনোনয়নের চিঠি তিনি প্রকাশ্যেও এনেছেন, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় তুলেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত নোবেল পুরস্কার প্রথম দেওয়া হয় ১৯০১ সালে। মোট ছয়টি শাখায় এই পুরস্কার দেওয়া হয়, যার মধ্যে শান্তির জন্য নোবেল একটি অন্যতম। মানবজাতিকে সম্প্রীতির পথে এগিয়ে নেওয়া এবং সশস্ত্র সংঘাত ও বৈরিতা হ্রাসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন এই পুরস্কার পেতে পারে। শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এটি একাধারে আন্তর্জাতিক এবং জাতিগত সংঘাতের প্রতি বিশ্বজনীন সচেতনতা বাড়ানোরও একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের নোবেল মনোনয়ন নতুন নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছিল, যা তখনও বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। এবারও একই রকম পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। বিশেষ করে, নেতানিয়াহুর এই মনোনয়ন ঘিরে সমালোচনা তীব্র হয়েছে। সুইডেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কার্ল বিল্ড এক্সে (সাবেক টুইটার) স্পষ্ট লিখেছেন, নেতানিয়াহু আসলে ট্রাম্পকে তোষামোদ করছেন। অনেকেই মনে করছেন, নেতানিয়াহু এই মনোনয়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের কৌশল নিয়েছেন। কারণ, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় রাখার ক্ষেত্রে সবসময় আগ্রহী ছিলেন এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সময় ইসরায়েল অনেক সুবিধা পেয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। এর আগে গত মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘর্ষের সময়ও ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তার মধ্যস্থতার ফলেই দুই দেশ যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছিল। এমনকি পাকিস্তান সরকারও বলেছিল, এই কারণে তারা ট্রাম্পকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য সুপারিশ করবে। তবে এই দাবিগুলো নিয়েও বিস্তর বিতর্ক রয়েছে, অনেকেই মনে করেন, এসব দাবির বাস্তবতা ততটা স্পষ্ট নয়।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য কে মনোনয়ন দিতে পারে, তা নিয়ে সুস্পষ্ট নিয়ম রয়েছে। কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, পার্লামেন্ট সদস্য, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, আইন ও দর্শনের অধ্যাপক, এবং আগের নোবেল বিজয়ীরা মনোনয়ন দিতে পারেন। তবে নিজেকে কেউ মনোনীত করতে পারে না। মনোনয়ন দেওয়া যায় প্রতিবছরের জানুয়ারি মাসের শেষ সময় পর্যন্ত। এরপর ফেব্রুয়ারিতে নরওয়ের নোবেল কমিটি মনোনয়ন তালিকা চূড়ান্ত করে। সেই হিসেবে নেতানিয়াহুর মনোনয়ন এই বছরের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ মনোনয়নের সময়সীমা ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। তবে এই মনোনয়ন আগামী বছরের বিবেচনায় আসতে পারে।
নরওয়ের পার্লামেন্ট গঠিত পাঁচ সদস্যের নোবেল কমিটি শান্তি পুরস্কারের চূড়ান্ত বিজয়ী নির্বাচন করে। প্রথমে একটি দীর্ঘ তালিকা থেকে যাচাই-বাছাই করে সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি হয়। এরপর প্রতিটি প্রার্থীকে বিশেষজ্ঞ ও স্থায়ী উপদেষ্টাদের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়। সাধারণত কমিটি সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করে, তবে প্রয়োজনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে বিজয়ী নির্বাচন হয়। অক্টোবর মাসে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয় এবং ডিসেম্বরে বিজয়ীর হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় একটি রাজনৈতিক বার্তাও প্রায়ই থাকে, যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের ইতিহাসে বিতর্ক নতুন নয়। ওবামা ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই যখন এই পুরস্কার পান, তখন তা নিয়ে তুমুল সমালোচনা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের আরও তিন প্রেসিডেন্ট—থিওডোর রুজভেল্ট, উড্রো উইলসন ও জিমি কার্টারও নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে কেবল কার্টার নোবেল পেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট থাকার সময় নয়, বরং পরে। এই চারজনের ক্ষেত্রেই নোবেল পুরস্কার পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক দেখা গিয়েছিল।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের ওয়েবসাইটে বলা আছে, বিশ্বের যেকোনো শ্রেণি-পেশার মানুষ এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হতে পারেন। পুরস্কারের ইতিহাসেও দেখা যায়, কৃষক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রনায়ক পর্যন্ত সবাই এই পুরস্কার পেয়েছেন। নোবেল শান্তি পুরস্কারের কমিটির চেয়ারম্যান জোরগেন ওয়াটনে ফ্রাইডনেসও বলেছেন, ‘বাস্তবে যে কেউ শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেতে পারেন।’
তবে শেষ পর্যন্ত পুরস্কার পাওয়ার শর্ত একটাই—শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাস্তব ও প্রমাণিত অবদান। কেবল মনোনয়ন পেলেই নোবেল মিলবে না, কারণ প্রতিবছর শত শত মনোনয়ন জমা পড়ে। গত বছর মনোনয়ন পেয়েছিলেন ২৮৬ জন, আর এ বছর সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩৮-এ, যার মধ্যে ২৪৪ জন ব্যক্তি এবং ৯৪টি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা।
নেতানিয়াহুর মনোনয়ন বাস্তবিক অর্থে ট্রাম্পের জন্য বিশেষ কোনো নিশ্চয়তা তৈরি করছে না। কারণ নোবেল কমিটি কেবল রাজনৈতিক বিবেচনায় পুরস্কার দেয় না, বরং কার্যকর অবদান এবং আন্তর্জাতিক শান্তি প্রক্রিয়ায় ভূমিকাই এখানে মুখ্য। তাছাড়া নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে মনোনয়ন দেওয়ার প্রক্রিয়াটি গোপন থাকে অন্তত ৫০ বছর, যদিও মনোনয়নদাতারা চাইলে নিজেদের মনোনয়নের কথা প্রকাশ করতে পারেন।
সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়—ট্রাম্প কি সত্যিই শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মতো অবদান রেখেছেন? নাকি নেতানিয়াহুর এই মনোনয়ন কেবলই একধরনের রাজনৈতিক কৌশল? উত্তর দিতে হলে অপেক্ষা করতে হবে নরওয়ের নোবেল কমিটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য, যা প্রতিবারের মতোই অক্টোবরেই জানা যাবে। তবে ইতিহাস বলে, নোবেল শান্তি পুরস্কারের ঘোষণার আগেও এবং পরেও বিতর্ক থামে না—এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au