আগে ‘শিবির’, এখন ‘ছাত্রলীগ’: বদলায়নি ট্যাগিংয়ের রাজনীতি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিক দল, সংগঠন বা মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত করে চিহ্নিত করার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ক্ষমতার সমীকরণ বদলালেও এই…
মেলবোর্ন, ২ আগষ্ট- প্রথমবারের মতো গাজার বিতর্কিত একটি মানবিক সহায়তা বিতরণকেন্দ্র পরিদর্শন করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ। শুক্রবার গাজার দক্ষিণাঞ্চলের রাফাহ এলাকায় অবস্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ)-এর একটি কেন্দ্র পরিদর্শন করেন তিনি। সফরকালে তার সঙ্গে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল দূত মাইক হাকাবি এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)-এর সদস্যরা।
উইটকফ বলেন, গাজার বাস্তব মানবিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ট্রাম্পকে অবহিত করাই ছিল এই সফরের মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি তিনি গাজাবাসীর জন্য খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার একটি পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করতে চান।
তবে এই সহায়তা কেন্দ্র নিয়ে চলছে ব্যাপক বিতর্ক। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের বিতরণকেন্দ্রের আশপাশে গুলিতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৮৫৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। যদিও এই সংখ্যা মানতে নারাজ জিএইচএফ।
ইসরায়েল দাবি করছে, তারা শুধুমাত্র সতর্কতামূলক গুলিই চালিয়েছে, সাধারণ নাগরিককে লক্ষ্য করে নয়। কিন্তু গাজার বাসিন্দারা, মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অনেকেই বলছেন ভিন্ন কথা। স্বাধীনভাবে সাংবাদিকদের গাজায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এসব তথ্য যাচাই কঠিন হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্র দূত উইটকফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লেখেন, “আজ আমরা পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় গাজার ভেতরে ছিলাম। পরিস্থিতি যাচাই করেছি এবং বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কথা বলেছি।” হাকাবি দাবি করেন, জিএইচএফ প্রতিদিন ১০ লাখেরও বেশি খাবার বিতরণ করছে। বৃহস্পতিবার সংগঠনটি ১৩ লাখ খাবার বিতরণের কথা জানায়।
তবে জাতিসংঘ বলছে, এই সহায়তা মোট প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তারা গাজায় পরিকল্পিত এবং মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ চলছে বলে সতর্ক করছে।
গাজার বাসিন্দাদের অনেকেই উইটকফের সফরকে ‘মিডিয়া স্টান্ট’ আখ্যা দিয়েছেন। লুআই মাহমুদ নামে এক ব্যক্তি বলেন, “উইটকফ ক্ষুধা দেখবেন না, তিনি দেখবেন শুধু ইসরায়েলের সাজানো গল্প। এটি মানবিক সফর নয়, মার্কিন সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার একটি প্রচার।”
গাজা শহরের আরেক বাসিন্দা আমের খাইরাত বলেন, “গাজার প্রয়োজন প্রেস টিমসহ আরেকজন দূত নয়, প্রয়োজন অবরোধ তুলে নেওয়া ও বোমাবর্ষণ বন্ধ করা।”
অক্সফামের মার্কিন অঞ্চলের পরিচালক স্কট পল বলেন, উইটকফ ও হাকাবি হয়তো তাদের গাড়ির জানালা দিয়ে হাজার হাজার অনাহারে থাকা, গৃহহীন ফিলিস্তিনি শিশু ও পরিবারদের দেখেছেন। তার মতে, এই বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রকে অবিলম্বে তাদের সম্পূর্ণ প্রভাব খাটিয়ে এই মানবিক বিপর্যয় বন্ধে উদ্যোগী হতে বাধ্য করা উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক আনেল শিলাইন, যিনি গাজা ইস্যুতে বাইডেন প্রশাসনের নীতির প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছিলেন, এই সফরকে ‘প্রচারমূলক ফটোসেশন’ বলে মন্তব্য করেন।
এমনকি জিএইচএফ-এ কাজ করা অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের সদস্য লেফটেন্যান্ট কর্নেল অ্যান্থনি আগুইলার বিবিসিকে বলেন, তিনি গাজার এসব সহায়তা কেন্দ্রে ইসরায়েলি সেনা ও মার্কিন ঠিকাদারদের ফিলিস্তিনি সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণ করতে দেখেছেন। তার ভাষায়, “পুরো ক্যারিয়ারে আমি কখনো এমন নিষ্ঠুরতা ও বেসামরিক, অনাহারে থাকা মানুষের ওপর এমন অপ্রয়োজনীয় সহিংসতা দেখিনি।” জিএইচএফ অবশ্য আগুইলারের অভিযোগকে ‘পুরোপুরি মিথ্যা’ দাবি করে তাকে ‘অসন্তুষ্ট সাবেক ঠিকাদার’ বলে উল্লেখ করেছে।
এদিকে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) অভিযোগ করেছে, ইসরায়েলি সেনা ও মার্কিন সমর্থিত ঠিকাদাররা ‘বিকৃত ও সামরিকীকৃত সহায়তা বিতরণ ব্যবস্থা’ তৈরি করেছে, যা রক্তাক্ত সংঘাতে পরিণত হয়েছে। তারা ইসরায়েলের প্রতি বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে এবং মার্কিন-ইসরায়েলি এই বিতরণ কার্যক্রম স্থগিতের দাবি জানিয়েছে।
গত মে মাসে জাতিসংঘের মাধ্যমে সহায়তা বিতরণ ব্যবস্থা বাদ দিয়ে গাজায় চারটি জিএইচএফ কেন্দ্র চালু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র, যা আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচিত হয়। ইসরায়েল অভিযোগ করে, হামাস জাতিসংঘের সহায়তা লুট করেছে। হামাস এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এই চারটি বিতরণকেন্দ্র ইসরায়েলি সামরিক অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত এবং মার্কিন বেসরকারি নিরাপত্তা ঠিকাদারদের দ্বারা পরিচালিত। একাধিক ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী ও চিকিৎসকরা অভিযোগ করেছেন, এই কেন্দ্রগুলোর আশেপাশে জড়ো হওয়া ভিড়ের ওপর ইসরায়েলি বাহিনী গুলি চালিয়েছে।
আইডিএফ জানিয়েছে, শুক্রবার সাতটি দেশ—বেলজিয়াম, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, ফ্রান্স, স্পেন ও জার্মানি—আকাশপথে ১২৬টি ত্রাণ প্যাকেট গাজায় পাঠিয়েছে। কিন্তু ত্রাণ সংস্থাগুলোর মতে, স্থলপথে আরও অনেক বেশি সহায়তা প্রবেশ না করলে এসব ‘ড্রপ’ প্রকৃত চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর জানিয়েছে, এ পর্যন্ত খাদ্য সংগ্রহের সময় অন্তত ১,৩৭৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৮৫৯ জন মারা গেছেন জিএইচএফ কেন্দ্রগুলোর আশেপাশে। অধিকাংশের মৃত্যু ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে হয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, নিহতরা সশস্ত্র ছিল না কিংবা কোনো হুমকি তৈরি করেনি।
ইসরায়েল এসব সহিংসতার জন্য হামাসকে দায়ী করছে। কিন্তু জিএইচএফ জাতিসংঘের তথ্য প্রত্যাখ্যান করেছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে শুক্রবার সকাল থেকে গাজার দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে হামাস-চালিত সিভিল ডিফেন্স এজেন্সি। এর মধ্যে খান ইউনুস ও দেইর আল-বালাহ এলাকায় দু’টি আলাদা বিমান হামলায় আটজন নিহত হন। এছাড়া রাফাহের উত্তরের মোরাগ করিডোরে সহায়তা বিতরণকেন্দ্রের কাছে গুলিতে আরও দুইজন নিহত এবং কমপক্ষে ২০ জন আহত হন।
হামাস-চালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় গাজায় মোট ৮২ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৫২ জন সহায়তা নিতে গিয়ে মারা যান।
এমন পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন উইটকফ। বৈঠকে যুদ্ধবিরতি আলোচনার নতুন রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি গণমাধ্যম। আলোচনায় ‘একসাথে সব জিম্মিমুক্তি’ এবং হামাসের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। হামাস বলছে, ত্রাণ প্রবেশ না করা পর্যন্ত তারা আলোচনায় ফিরবে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এক সপ্তাহ আগে হামাসকে ‘অসহযোগিতা’ ও ‘অপরিণত মনোভাবের’ অভিযোগ এনে আলোচনায় থেকে সরে আসে। হামাস পাল্টা অভিযোগ করে বলেছে, মূল বিষয়গুলোতে ইসরায়েলের অনমনীয় মনোভাব আলোচনায় অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করছে।
সুত্রঃ বিবিসি
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au