বাম দিক থেকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল দেশের সংলাপ সভায় যোগ দিতে পৌঁছেছেন।
© Wu Hong/AP
মেলবোর্ন, ৩০ আগষ্ট- চীনের তিয়ানজিনে এই সপ্তাহান্তে অনুষ্ঠিতব্য সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক দৃষ্টি এখন বেইজিংয়ের দিকে। বিশেষ করে প্রশ্ন উঠছে—ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে কতটা প্রশমিত করার চেষ্টা করবে চীন? রাশিয়ার অব্যাহত বিমান হামলা যখন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন শহরে চলছে এবং ইউরোপীয় দেশগুলো মস্কোর ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানাচ্ছে, তখনই প্রায় ২০ জন রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে এই সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন পুতিন। এসসিও নিজেকে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্ব ব্যবস্থার বিকল্প শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে।
এই সংগঠনের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, বেলারুশ, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তান। বহুমুখী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক স্বার্থে জড়িয়ে থাকা এই দেশগুলোর জন্য বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বেশ জটিল।
উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ভারতের ওপর ৫০% শুল্ক আরোপ করেছেন মূলত রাশিয়ান তেল আমদানি চালিয়ে যাওয়ার কারণে। এই সিদ্ধান্ত দিল্লি এবং ওয়াশিংটনের সম্পর্ককে নতুন করে চাপে ফেলেছে, যা এসসিও-র অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।
চীনের দৃষ্টিভঙ্গি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বেইজিং প্রকাশ্যে বলছে, ইউক্রেন সংকটের একমাত্র সমাধান হলো সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন কিয়েভে সাম্প্রতিক রুশ বোমাবর্ষণের পর বলেছেন, “সংলাপই ইউক্রেন সংকট সমাধানের একমাত্র পথ। আমরা আশা করি যুদ্ধক্ষেত্রের আগুন যেন ছড়িয়ে না পড়ে।” কিন্তু বাস্তবে চীন রাশিয়াকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সহায়তা করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিযোগ, রাশিয়ার সামরিক শিল্পভিত্তি টিকিয়ে রাখতে চীনই সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী, যা যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে।
ইউরোপীয় কূটনৈতিক মহল পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে, বেইজিংয়ের সহযোগিতা ছাড়া রাশিয়ার এই যুদ্ধ এতটা দীর্ঘস্থায়ী ও প্রভাবশালী হতে পারত না। তবুও চীন একধরনের দ্বৈত নীতি অবলম্বন করছে—একদিকে যুদ্ধ শেষ করার আহ্বান, অন্যদিকে মস্কোর নিঃসঙ্গতা এড়াতে প্রয়োজনীয় সমর্থন।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি বিশেষজ্ঞ হোসুক লি-মাকিয়ামা ইউরোনিউজকে বলেছেন,
“চীন প্রকাশ্যে ও গোপনে স্পষ্ট করেছে যে তারা যুদ্ধের সমাপ্তি চায়, কিন্তু রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দেখতে রাজি নয়। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বললে দেখা যায়, তারা চীনের ব্যাপারে বিশেষ উদ্বিগ্ন নন।”
এই সম্মেলনে চীন-ভারত সম্পর্কও আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাম্প্রতিক মার্কিন শুল্ক আরোপ দিল্লিকে ক্ষুব্ধ করেছে এবং বাণিজ্য সংকট বাড়িয়েছে। তাই বেইজিং ও দিল্লি উভয়েই বুঝতে পারছে, পূর্ব ইউরোপে যুদ্ধ যদি আরও তীব্র হয় তবে বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা আরও গভীর হতে পারে। ফলে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা এই সম্মেলনের আরেকটি কূটনৈতিক অগ্রাধিকার হতে পারে।
শীর্ষ সম্মেলনের পর পুতিন ও আরও কয়েকজন নেতা বেইজিংয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের ওপর চীনের বিজয়ের ৮০তম বার্ষিকী উপলক্ষে সামরিক কুচকাওয়াজে যোগ দেবেন। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেবেন স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকো। তার পাশাপাশি থাকবেন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচ, যাদের দেশ ভবিষ্যতে এসসিও-র সদস্যপদ পাওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থী।
এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, এসসিও সম্মেলন কেবলমাত্র আনুষ্ঠানিক আলোচনা নয়, বরং রাশিয়ার আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। চীন কতটা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে পুতিনকে প্রশমিত করার পথে হাঁটবে এবং ভারতের সঙ্গে কীভাবে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে, তা এই সম্মেলনের প্রধান প্রশ্ন হিসেবে সামনে এসেছে। এটি স্পষ্ট যে, বেইজিং চাইছে বৈশ্বিক ভারসাম্যে নিজের ভূমিকা আরও জোরদার করতে, এবং সেই পথে রাশিয়াকে হাতছাড়া করতে রাজি নয়।