বাংলাদেশ

রংপুরের চার হত্যাকাণ্ড

ভয়াল সেই ভোররাতে ছোট বোনকে ফোন করেছিলেন গণপতির স্ত্রী, রিসিভ না করলেও ২ দিন খোঁজ নেয়নি পূজা

  • 12:58 am - September 08, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৬৪ বার
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের চারজনকে হত্যার খবরে স্বজনদের আহাজারি। ছবিঃ সংগৃহীত

রংপুরের মাছুয়াপাড়া এলাকার একই পরিবারের চার সদস্য হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারেন নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর ছোট বোন এবং শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর শ্যালিকা পূজা চক্রবর্তী। গত ১৯ আগস্ট মাছুয়াপাড়ার বাড়িতে অজ্ঞাতপরিচয় হামলাকারীদের হাতে পরিবারের চার সদস্য নিহত হওয়ার পর হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এখনো হত্যার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা যায়নি।

গত ৩০ আগস্ট ‘নর্থইস্ট নিউজ’-এর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলার সময় পূজা চক্রবর্তী হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তার বক্তব্যে হত্যাকাণ্ডের সময় ও ঘটনার ধারাবাহিকতা নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে।

রংপুরের গুপ্তপাড়ার বাসিন্দা পূজা জানান, পরিবারের সঙ্গে তার সর্বশেষ সরাসরি যোগাযোগ হয়েছিল ১৯ আগস্ট রাতে হোয়াটসঅ্যাপে। রাত ১১টা ২৬ মিনিটে শুরু হওয়া ওই ফোনালাপ চলে ৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড। এ সময় তিনি তার বড় বোন প্রীতিলতা ও আগমীর সঙ্গে কথা বলেন। তাদের কথাবার্তায় অস্বাভাবিক কিছু তিনি বুঝতে পারেননি।

শেষ কথোপকথনের একটি স্বাভাবিক মুহূর্তের কথাও স্মরণ করেন পূজা। তিনি জানান, আগমী বলেছিল, তার লম্বা চুলের আগা অনেক বড় হয়ে গেছে। তাই পূজার বাসায় গিয়ে চুলের আগা ছেঁটে নেবে।

পূজা বলেন, ২০ আগস্ট সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি প্রীতিলতার নম্বর থেকে একটি মিসড কল দেখতে পান। সাধারণত প্রীতিলতা তার সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপেই কথা বলতেন। ওই রাতে পূজা নিজের ফোনের ওয়াই-ফাই বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ফলে রাত ২টা ৪০ মিনিটে করা ওই কলটি তিনি ধরতে পারেননি।

পূজার ভাষ্য, ফোনের কল রেকর্ডে রাত ২টা ৪০ মিনিটের ওই কলের তথ্য রয়েছে। তবে প্রীতিলতা সাধারণত এত রাতে তাকে ফোন করতেন না।

তবে এরপর ২১ ও ২২ আগস্ট প্রীতিলতার সঙ্গে পূজার আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। পূজাও ওই সময় বড় বোনকে ফোন করেননি। ২২ আগস্ট রাত প্রায় ৮টা ৪৫ মিনিটে তিনি প্রীতিলতাকে ফোন করেন। কিন্তু কলটি সংযোগ হয়নি। এরপর আগমীর মোবাইল ফোনেও যোগাযোগের চেষ্টা করেন তিনি। সেটিও বন্ধ পান।

বিষয়টি তাকে উদ্বিগ্ন করে তোলে।

এদিকে পরিবারের সদস্যদের হত্যার সম্ভাব্য কারণ কিংবা বাইরের কারও সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা নিয়ে নানা আলোচনা চললেও পূজা জানান, তিনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুরোপুরি হতবাক।

রংপুরে একটি ধর্মীয় সংখ্যালঘু পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ছবিঃ সংগৃহীত

তার ভাষ্য, গণপতি ও প্রীতিলতা খুব বেশি মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতেন না। পরিবারের ওপর কোনো ধরনের বাহ্যিক হুমকি ছিল কি না, সে বিষয়েও তিনি কিছু জানতেন না। তার দাবি, হত্যাকাণ্ডের আগে পরিবারের কেউ কোনো হুমকি, সতর্কবার্তা বা ভয়ভীতি দেখানোর কথা তাকে জানাননি।

নিহতদের সম্পর্কে পূজা বলেন, গণপতি ছিলেন অত্যন্ত নিরীহ ও শান্ত স্বভাবের মানুষ। আর প্রীতিলতা ছিলেন একজন সাধারণ গৃহিণী। তিনি ব্যক্তিগত জীবন খুব গোপন রাখতেন এবং রংপুরে বসবাসকারী অন্য নারীদেরসহ তার বন্ধু বা পরিচিতদের সম্পর্কে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তেমন আলোচনা করতেন না।

প্রীতিলতার সঙ্গে কোনো পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা সম্পর্ক ছিল কি না, এমন আলোচনা সম্পর্কেও পূজা কিছু জানেন না বলে জানান। তার বক্তব্য, এ ধরনের কোনো বিষয় তার বোন কখনো তাকে জানাননি।

পূজা আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের পাঁচ থেকে ছয় দিন পর পুলিশ কর্মকর্তাদের একটি দল তার বাড়িতে যায়। তবে ওই দলের নেতৃত্বে ছিলেন না গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী। পুলিশ সদস্যরা তার কাছ থেকে বিস্তারিত বক্তব্য নেন এবং বিভিন্ন তথ্য নোট করেন।

২২ আগস্ট রাতে বাড়িতে গিয়ে যা দেখেন পূজা

২২ আগস্ট সন্ধ্যায় স্বামী বিপুল চক্রবর্তীকে সঙ্গে নিয়ে মাছুয়াপাড়ার বাড়িতে যান পূজা। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান, বাড়িটি অস্বাভাবিক নীরব ও সাড়া-শব্দহীন। তখনো পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়নি। পূজার উদ্বেগ দেখে আশপাশের লোকজনও সেখানে জড়ো হন।

বাড়ির প্রধান ফটকে তালা লাগানো ছিল। পরে বিপুল সীমানাপ্রাচীর টপকে একটি বারান্দায় প্রবেশ করেন। ভেতরে তখন অন্ধকার। সেই অন্ধকারের মধ্যেই তিনি মেঝেতে বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখেন।

বাড়ির পেছনের দিকে গিয়ে পূজা দেখতে পান, একটি বারান্দার দরজা সামান্য খোলা। মোবাইল ফোনের আলো দিয়ে অন্ধকার ঘরের ভেতরে তাকিয়ে তিনি দেখতে পান, কাপড়চোপড় এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। গণপতি ও আয়ুষ সাধারণত যেসব বিছানায় ঘুমাতেন, সেসব বিছানার ওপর মশারি তখনো টানানো ছিল।

বাড়িটির বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও পূজার নজরে আসে। তিনি দেখতে পান, আশপাশের বাড়িগুলোতে বিদ্যুৎ থাকলেও তাদের বাড়িটি অন্ধকারে ছিল। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসার পর রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টা থেকে পৌনে ১১টার মধ্যে বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় চালু হয়।

স্থানীয় বিদ্যুৎ মিস্ত্রি উজ্জ্বল কুমার বর্মণ পরে দেখতে পান, চক্রবর্তী পরিবারের বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগের লাইন হাতে করে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। তার পর্যবেক্ষণে তারের কোনো ত্রুটি বা শর্টসার্কিটের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা প্রধান ফটক খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন। ফটকটি ভেতর থেকে সাধারণ তালা দিয়ে আটকানো ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিপুল চক্রবর্তী মোবাইল ফোনের আলো ব্যবহার করে বাড়ির প্রথম তলার খোলা খাবার ঘরে প্রবেশ করেন। সেখানে কাঠের আলমারি বা ক্যাবিনেটের বিভিন্ন জিনিসপত্র মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। এর মধ্যে অলংকার ও কাপড়চোপড়ও ছিল।

খাবার টেবিলে কয়েকটি জিনিস পড়ে ছিল। এর মধ্যে আচারের বোতল, খোসা ছাড়ানো শসার অবশিষ্টাংশ, খেজুরের বিচি এবং ইয়াবা সেবনের সময় ব্যবহৃত হয় বলে উল্লেখ করা কিছু ফয়েল ছিল।

বাড়ির বিভিন্ন স্থানে মিলল চারজনের মরদেহ

পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ বাড়ির বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যায়। ছাদে ওঠার সিঁড়ির কাছে প্রীতিলতা ও আগমীর মরদেহ পড়ে ছিল।

গণপতির মরদেহ পাওয়া যায় উপুড় অবস্থায়। তার শরীরের ওপরের অংশ ছিল খালি এবং পরনে ছিল নীল-সবুজ ডোরাকাটা লুঙ্গি।

অন্যদিকে আয়ুষের মরদেহ পাওয়া যায় দেয়ালের পাশে ঠেলে রাখা একটি খাটের নিচে। তার পরনে ছিল শুধু কালো শর্টস, শরীরের ওপরের অংশ ছিল খালি।

পুলিশ পূজাকে বাড়ির প্রথম তলায় উঠতে দেয়নি। তবে তার স্বামী বিপুল চক্রবর্তী সেখানে যান। তিনি গণপতির সঙ্গে যে কক্ষে আয়ুষ থাকত, সেখানেই তার মরদেহ দেখতে পান।

চক্রবর্তী পরিবারের ব্যবহৃত তিনটি শোবার ঘরেই মশারি টানানো ছিল বলে পূজা জানান।

ঘটনার ভয়াবহতা প্রকাশ পাওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে খবর দেওয়া হয়। পরে পরিবারের সদস্যদের থানায় গিয়ে যোগাযোগ করতে বলা হয় এবং বিশেষায়িত তদন্তকারী দল ঘটনাস্থলে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

রংপুরের মাছুয়াপাড়ার ওই বাড়িতে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলার মধ্যে পূজা চক্রবর্তীর দেওয়া ঘটনাক্রম, বিশেষ করে ১৯ আগস্ট রাত ১১টা ২৬ মিনিটের শেষ স্বাভাবিক কথোপকথন, ২০ আগস্ট রাত ২টা ৪০ মিনিটের মিসড কল, পরবর্তী সময়ে ফোন বন্ধ পাওয়া এবং ২২ আগস্ট রাতে বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়গুলো তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে সামনে এসেছে।

সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ

এই শাখার আরও খবর

ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের উপস্থিতি কেন ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?

আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ব্রিকস সম্মেলন ২০২৬। গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।…

পাবনায় বিএনপি নেতাকে গুলি, মৃত্যু নিশ্চিত করতে কুপিয়ে হত্যা

পাবনার আটঘরিয়ায় আদম আলী (৬০) নামে এক বিএনপি নেতাকে গুলি করে এবং পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে উপজেলার…

শেখ হাসিনা কি আবারও বাংলাদেশের ক্ষমতায় ফিরতে পারবেন?

২৪ এর আন্দোলনে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দুই বছর পূর্ণ হওয়ার দিন, গত ৫ আগস্ট ভারত থেকে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি ঘোষণা করেন, ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে…

রংপুরের চার খুন: তদন্তের কেন্দ্রে এখন পুলিশ কর্মকর্তা মাবুদ ও সনাতন

রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় তদন্তের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন আর শুধু কে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগমী ও ১২ বছরের ছেলে…

‘জিস্‌ম’ করার পর কেরিয়ার শেষ হয়ে যেতে পারে, বিপাশা

২০০১ সালে ‘অজনবী’ সিনেমার মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক হয় বিপাশা বসুর। এরপর ‘রাজ’-এর মতো একাধিক সফল সিনেমায় অভিনয় করে নিজের অবস্থান শক্ত করেন তিনি। তবে ২০০৩…

১২ বছরের নাতনিকে ধর্ষণ, দাদার যাবজ্জীবন

লালমনিরহাটের পাটগ্রামে ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে প্রতিবেশী দাদা মোক্তার উদ্দিনকে (৫০) যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au