নিহত প্রদীপের পরিবার। ছবি: ডেইলি স্টার
মেলবোর্ন, ১ সেপ্টেম্বর- রংপুরের তারাগঞ্জে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন প্রদীপ লাল রবিদাস (৪৭)। তার মৃত্যুর পর পরিবারে নেমে এসেছে গভীর অন্ধকার। সংসারের একমাত্র ভরসা হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্ত্রী-সন্তানরা।
প্রদীপের মেয়ে পলাশী রবিদাস (১৬) এ বছর এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। কান্না জড়ানো কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার আর পরীক্ষা দেওয়া হবে না। বাবা নেই। তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে মেরেছে। সংসারের ভরসা চলে গেছে। এখন তো একমুঠো ভাতের জন্যও আমাদের কষ্ট করতে হচ্ছে।”
বড় ছেলে দুলাল রবিদাস (১৯) ২০২২ সালে এসএসসি পাস করলেও দারিদ্র্যের কারণে কলেজে ভর্তি হতে পারেননি। সংসারের হাল ধরতে এখন দিনমজুর হিসেবে কাজ করছেন। ছোট ছেলে আপন রবিদাস (১৩) সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে।
মিঠাপুকুর উপজেলার মিলনপুর ইউনিয়নের খামার মকিমপুর গ্রামে প্রদীপের ভাঙাচোরা টিনের ঘরে আশ্রয় তাদের। নিজস্ব জমি নেই, অন্যের জমিতে থাকেন। আগে ফুটপাতে জুতা সেলাই করতেন তিনি। ছয় বছর আগে অসুস্থ হয়ে পায়ের গোড়ালি হারানোর পর জনপ্রতিনিধি ও গ্রামবাসীর সহায়তায় একটি ব্যাটারিচালিত ভ্যান পান। সেটি চালিয়েই কোনো রকমে সংসার চলছিল।
প্রদীপের মেয়ে পলাশী বলেন, “বাবা প্রতিবন্ধী হয়েও ভ্যান চালিয়ে আমাদের পড়াশোনার খরচ দিতেন। তিনি চাইতেন আমরা সবাই উচ্চশিক্ষিত হই। কিন্তু সেই স্বপ্ন কেড়ে নিল মব সন্ত্রাসীরা।” ছোট ছেলে আপন চোখের জল মুছে বলল, “পড়াশোনা হয়তো আর হবে না। বাবার পথ ধরে আমাকেও জুতা সেলাই করতে হবে। ক্ষুধা তো আর বই পড়ে মেটে না।”
বড় ছেলে দুলাল জানান, দিনমজুরি করে দিনে ৩০০–৪০০ টাকা আয় হয়। “বাবা যে ভ্যান চালাতেন, সেটা এখন পুলিশের কাছে। ওটা ফিরে পেলে হয়তো আয়ে কিছুটা বাড়ত। ভাইবোন পড়াশোনা করতে চায়, কিন্তু একা আমি কিছুই করতে পারছি না।”
প্রদীপের স্ত্রী দুলালী রানী রবিদাস (৪২) ভাঙা গলায় বলেন, “অন্যের জমিতে থাকি। ঘরটাও ভাঙা। স্বামী কষ্ট করে হলেও প্রতিদিন ৫০০–৬০০ টাকা রোজগার করতেন। সেই মানুষটাকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে ওরা। আমি বিধবা, আমার সন্তানরা এতিম।”
গত ৯ আগস্ট দুপুরে বাড়ির পাশের বাজার থেকে ফল কিনে মামা রূপলালের বাড়ি যাচ্ছিলেন প্রদীপ। সেদিন রাতেই তারাগঞ্জ উপজেলার বুড়িরহাট বটতলায় ভ্যানচোর সন্দেহে স্থানীয় কয়েকজন তাদের আটক করে। মুহূর্তেই সেখানে মব তৈরি হয়। প্রকাশ্যে পিটুনি চললেও উপস্থিত পুলিশ ভয়ে হস্তক্ষেপ করেনি। পরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয় তাদের। হাসপাতালে নেওয়ার পর একজন ঘটনাস্থলেই মারা যান, অন্যজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান কয়েক ঘণ্টা পর।
প্রতিবেশী সুবল সরেন (৪৮) বলেন, “প্রদীপ সৎ মানুষ ছিল। প্রতিদিন মন্দিরে বসতাম, সে সবসময় সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে চিন্তিত থাকত।” গ্রামের প্রবীণ শিক্ষক জিতেন চন্দ্র আচার্য্য (৮৪) বলেন, “দারিদ্র্যের মধ্যেও প্রদীপ ছিল সৎ, পরিশ্রমী। কিন্তু আমাদের গ্রামের কারওই এত সামর্থ্য নেই যে তার পরিবারকে সহায়তা করতে পারে।”
মব সন্ত্রাসে প্রদীপের জীবন নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকারে ডুবে গেছে তার পরিবারও। এখন প্রতিদিনের সংগ্রাম শুধু টিকে থাকার জন্য।