সাজেকে ‘সশস্ত্র গোষ্ঠীর’ সঙ্গে সেনাবাহিনীর গোলাগুলি। ছবিঃ সংগৃহীত
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে অবরোধের মধ্যে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সময় সেনাবাহিনী ও একটি ‘সশস্ত্র গোষ্ঠীর’ মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সাজেকের উজো বাজার এলাকায় থেমে থেমে এ গোলাগুলি চলে। এতে সেনাবাহিনীর তিন থেকে চারজন সদস্য এবং পুলিশের দুজন সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব।
তবে গোলাগুলির ঘটনা অস্বীকার করেছে পাহাড়ের সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)।
সংগঠনটির দাবি, সাজেকবাসীর শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচি বানচাল করতে নিরাপত্তা বাহিনী একতরফাভাবে গুলিবর্ষণ করেছে। অন্যদিকে, আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) বলেছে, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর গুলি চালালে সেনাবাহিনী আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায়।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিনভর সাজেকের উজো বাজার এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টায় আটকে পড়া পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়া হয়। পুলিশ জানিয়েছে, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
যেভাবে শুরু হয় উত্তেজনা
সাজেক থেকে জেএসএসের সন্তু লারমা অংশের ‘সশস্ত্র’ সদস্যদের সরিয়ে নেওয়াসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছে সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন। এরই অংশ হিসেবে বুধবার বিকালে সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ঘোষণা করে সংগঠন দুটি। একই সঙ্গে পর্যটকদের সাজেক ছেড়ে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
পরিস্থিতির কারণে পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন। বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টার মধ্যে পর্যটকদের নিরাপদে সাজেক ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে সাজেক সড়কের উজো বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে খাগড়াছড়িতে ফিরিয়ে নিতে উদ্যোগ নেয় সেনাবাহিনী ও পুলিশ।
সাজেক পর্যটনকেন্দ্রের লাইনম্যান হেপিং ত্রিপুরার ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রায় সাড়ে চার শতাধিক ছোট-বড় গাড়িতে পর্যটকেরা সাজেক ত্যাগ করেন। গাড়িবহরটি সাজেক ভ্যালি থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের উজো বাজার এলাকায় পৌঁছালে অবরোধকারীরা সেটি আটকে দেন। এতে প্রায় সোয়া দুই হাজার পর্যটক আটকা পড়েন।
সে সময় সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটির সভাপতি বাবুধন চাকমা বলেন, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে অবরোধ পালন করছেন এবং পর্যটকবাহী গাড়িসহ কোনো ধরনের যানবাহন চলতে দেওয়া হবে না। সড়কে অবস্থান নিয়ে পর্যটকদের গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাঁদের নেই বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন জানান, অবরোধকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে পর্যটকদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছিল পুলিশ।
পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়ার সময় সংঘর্ষ
সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে উজো বাজার এলাকায় উত্তেজনা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবরোধকারীদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিতে উদ্যোগ নেন। এ সময় লাঠিপেটার মুখে অবরোধকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান বলে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে।
পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাহারায় পর্যটকদের গাড়িবহর বেলা ১১টার দিকে উজো বাজার এলাকা ছেড়ে খাগড়াছড়ির দিকে রওনা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পর্যটকদের গাড়িবহর সরিয়ে নেওয়ার পর সকাল ১১টার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। এর জবাবে সেনাবাহিনীর সদস্যরা পাল্টা গুলি চালান। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত থেমে থেমে গোলাগুলি চলে।
সাজেক থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন বলেন, অবরোধকারীরা প্রথমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বাধা দেন এবং তাঁদের লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়েন। পরে সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউপিডিএফ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি চালালে সেনাবাহিনী পাল্টা গুলি চালায়।
তবে পুলিশ ও আইএসপিআরের বক্তব্যের বাইরে গোলাগুলির সূত্রপাত নিয়ে ইউপিডিএফ ভিন্ন দাবি করেছে।
সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্য আহত
বৃহস্পতিবার দুপুরে রাঙামাটি পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব। তিনি জানান, পর্যটকদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে উজো বাজার এলাকায় অবরোধকারীদের সড়ক ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এ সময় অবরোধকারীরা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে সেনাবাহিনীর তিন থেকে চারজন সদস্য এবং পুলিশের দুজন সদস্য আহত হন।
পুলিশ সুপার বলেন, পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হলে বাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালান। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে থেমে থেমে গোলাগুলির পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে উজো বাজার এলাকার নিয়ন্ত্রণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে রয়েছে। সব পর্যটককে নিরাপদে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, আইএসপিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা স্থানীয়দের জোরপূর্বক ‘মানবঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করে সড়ক অবরোধ করেন এবং পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর গুলিবর্ষণ করেন। এ সময় সেনাবাহিনীর টহল দল আত্মরক্ষা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাল্টা গুলি চালায়। পরে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।
আইএসপিআর জানায়, সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বিত প্রচেষ্টায় অবরুদ্ধ পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাদের বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে উল্লেখ করা হয়। তবে পুলিশ সুপার সংবাদ সম্মেলনে বাহিনীর সদস্যদের আহত হওয়ার তথ্য জানান।
গোলাগুলির খবর অস্বীকার ইউপিডিএফের
সাজেকের উজো বাজার এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলির খবরকে ‘সর্বৈব মিথ্যা ও বানোয়াট’ বলে দাবি করেছে ইউপিডিএফ।
সংগঠনটির মুখপাত্র অংগ্য মারমা এক বিবৃতিতে বলেন, স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলির ঘটনার সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে তাঁদের দাবি।
অংগ্য মারমার অভিযোগ, জেএসএসের সন্তু লারমা অংশের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে স্থানীয়দের চলমান অবরোধ কর্মসূচি বানচাল করতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা একতরফাভাবে বিভিন্ন দিকে গুলিবর্ষণ করেছেন।
এ ছাড়া শান্তিপূর্ণ অবরোধকারীদের ওপর হামলা, লাঠিপেটা, ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও করেছে সংগঠনটি। বিবৃতিতে এসব ঘটনার নিন্দা জানিয়ে সাজেকবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জেএসএসের সন্তু লারমা অংশের সশস্ত্র সদস্যদের এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
তবে ইউপিডিএফের এসব অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তিতে। সেখানে সশস্ত্র সদস্যদের গুলিবর্ষণের কথা বলা হয়েছে।
তিন দফা দাবিতে অবরোধ
সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন তিন দফা দাবিতে এ আন্দোলন চালিয়ে আসছে। এর মধ্যে সাজেক ভ্যালি থেকে জেএসএসের সন্তু লারমা অংশের ‘সশস্ত্র’ সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবি অন্যতম।
এই দাবিকে কেন্দ্র করে বুধবার বিকালে অনির্দিষ্টকালের জন্য সাজেক পর্যটন সড়কে অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়। অবরোধের কারণে পর্যটকদের চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় জেলা প্রশাসন পর্যটনকেন্দ্রটি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে এবং বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টার মধ্যে পর্যটকদের সাজেক ছাড়ার নির্দেশ দেয়।
অবরোধের মধ্যে পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়াকে কেন্দ্র করেই বৃহস্পতিবার উজো বাজার এলাকায় উত্তেজনা, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং গোলাগুলির ঘটনা ঘটে বলে পুলিশ ও আইএসপিআরের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তবে গোলাগুলির ঘটনা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ইউপিডিএফের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী।
দিন শেষে পুলিশ জানিয়েছে, সাজেকের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে অবরোধের মূল দাবিগুলোর বিষয়ে কোনো সমাধান হয়েছে কি না, সে বিষয়ে দেওয়া তথ্যের মধ্যে স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি।