ভোটের প্রচারে বিলবোর্ডের ব্যবহার সীমিত করল ইসি । ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৫ সেপ্টেম্বর- ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের প্রচারে বড় পরিবর্তন আনল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এবার থেকে কোনো প্রার্থীই প্রচারে পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না। পাশাপাশি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর উপাদানে তৈরি লিফলেট, ফেস্টুন, ব্যানার, পলিথিন, রেক্সিন বা পিভিসি দিয়ে তৈরি প্রচারসামগ্রীও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সীমিত আকারে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও একজন প্রার্থী এক আসনে সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন।
নির্বাচনী প্রচার ও আচরণবিধি–২০২৫ চূড়ান্ত করেছে ইসি। গত মঙ্গলবার প্রস্তাবিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনীর পাশাপাশি নতুন আচরণবিধি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ হলে ইসি গেজেট আকারে তা প্রকাশ করবে। আরপিওর মতো উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই।
ইসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এবারের জাতীয় নির্বাচনে আর কোনো প্রার্থীই পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না। শুধু রঙিন নয়, সাদাকালো পোস্টার ব্যবহারেও অনুমতি দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে সুপারিশ করলেও ইসি তা গ্রহণ করেনি। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসি কর্মকর্তারা।
এবার প্রচারে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে বিলবোর্ডের ব্যবহার। তবে প্রার্থীরা সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন। প্রতিটি বিলবোর্ডের আকার হতে হবে সর্বোচ্চ ১৬/৯ ফুট। বিলবোর্ড স্থাপনের ক্ষেত্রে শর্ত দেওয়া হয়েছে—
- জনসাধারণ বা যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটানো যাবে না।
- পরিবেশ বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে না।
- প্রচারণায় অতিরিক্ত খরচ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যাবে না।
ইসির যুক্তি, বিলবোর্ড তৈরিতে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়, যা নির্বাচনী ব্যয়সীমা অতিক্রম করতে পারে। ফলে এ নিয়ে প্রার্থীদের মধ্যে বৈষম্য ও বিশৃঙ্খলার সম্ভাবনা থাকে।
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, “ভোটের প্রচারে পোস্টার ব্যবহার বন্ধের প্রস্তাব ছিল নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের। আমরা এতে একমত হয়েছি। বিলবোর্ড এবার নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে, তবে তা সীমিত রাখা হয়েছে।”
নতুন আচরণবিধিতে প্রচার কার্যক্রম, খরচ, প্রযুক্তি ব্যবহার ও প্রার্থীদের দায়িত্ব নিয়ে বেশ কিছু বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- এক মঞ্চে প্রচার: প্রতিটি আসনে সব প্রার্থীর জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তারা এক দিনে মঞ্চের প্রচারের সময়সীমা: ভোটের প্রচার চালানো যাবে সর্বোচ্চ তিন সপ্তাহ।
- আয়োজন করবেন, যেখানে প্রার্থীরা নিজেদের ইশতেহার পাঠ করবেন।
- গণমাধ্যম সংলাপ: প্রার্থী ও প্রতিনিধিরা টেলিভিশন বা গণমাধ্যমে নির্বাচনী সংলাপে অংশ নিতে পারবেন। তবে কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা যাবে না।
- ভিভিআইপি তালিকা সম্প্রসারণ: প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপি, মেয়র ছাড়াও অন্তর্বর্তী সরকার বা উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের ভিভিআইপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে নামতে পারবেন না।
- ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহার: প্রচারে ড্রোন বা কোয়াডকপ্টার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। দলের সাধারণ সম্পাদক বা সমপর্যায়ের নেতারা হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে পারবেন, তবে সেখান থেকে প্রচারসামগ্রী বিতরণ নিষিদ্ধ।
- ভোটার স্লিপ: ভোটকেন্দ্রের ১৮০ মিটারের মধ্যে ভোটার স্লিপ বিতরণ করা যাবে না। স্লিপের আকার সর্বোচ্চ ১২x৮ সেন্টিমিটার হতে হবে।
- মাইক ব্যবহারের নিয়ম: শব্দের মাত্রা সর্বোচ্চ ৬০ ডেসিবেল এবং সময় দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।
- সামাজিক মাধ্যম ও এআই: সামাজিক মাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কোনো প্রচার, কনটেন্ট তৈরি, প্রতিপক্ষকে আক্রমণ বা বিভ্রান্তি ছড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- দলীয় দায়বদ্ধতা: প্রার্থীদের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলকেও আচরণবিধি মেনে চলার অঙ্গীকারনামা দিতে হবে।
- শাস্তির বিধান: আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা জরিমানা ও ছয় মাসের কারাদণ্ড হতে পারে। গুরুতর অপরাধে প্রার্থিতা বাতিলের বিধানও যুক্ত হয়েছে।
নতুন বিধানে সাইবার বুলিং থেকে নারী প্রার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিতের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে কোনো প্রার্থীর পক্ষে সরাসরি প্রচারণা চালানো যাবে না।
ইসির এই নতুন আচরণবিধি নির্বাচনী প্রচারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। পোস্টারবিহীন প্রচার, সীমিত বিলবোর্ড এবং সামাজিক মাধ্যমের কড়াকড়ি—সব মিলিয়ে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবারের প্রচার কার্যক্রম অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব ও সুশৃঙ্খল হবে বলে আশা করছে নির্বাচন কমিশন।