১৯৭০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের একতরফা নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৫ সেপ্টেম্বর- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কোনো বৈরী দেশকে চাপে রাখার কার্যকর অস্ত্র হিসেবে পশ্চিমা দেশগুলো নিয়মিতই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে। তবে এসব নিষেধাজ্ঞা কতটা সফল হয়েছে তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, এতে কোটি কোটি মানুষ ভুক্তভোগী হয়েছেন এবং প্রাণ হারিয়েছেন—এ বিষয়ে কোনো সংশয় নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের একতরফা নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ডেনভার বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিসকো রদ্রিগেজের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় বলা হয়েছে, শুধু ১৯৯০-এর দশকের কিছু বছরে এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষ মারা গেছেন। আর সর্বশেষ ২০২১ সালেই নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রাণ গেছে ৮ লাখেরও বেশি মানুষের।
যুদ্ধের চেয়ে ভয়াবহ প্রভাব
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতি বছর নিষেধাজ্ঞাজনিত মৃত্যু যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত মানুষের সংখ্যার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। যেখানে গড়ে বছরে প্রায় এক লাখ মানুষ যুদ্ধে মারা যায়, সেখানে নিষেধাজ্ঞার কারণে মারা যায় কয়েক লাখ। এদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি শিশু ও প্রবীণ, যারা অপুষ্টি, ওষুধ ও মৌলিক চাহিদার অভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। কেবল ২০১২ সালের পর থেকে নিষেধাজ্ঞার কারণে এক মিলিয়নেরও বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
‘ক্ষুধা সৃষ্টি’ মূল কৌশল
গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, ক্ষুধা ও বঞ্চনা পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার অনিচ্ছাকৃত ফল নয়; বরং এগুলোই মূল লক্ষ্য। উদাহরণ হিসেবে ১৯৬০ সালের মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক গোপন নথির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে কিউবায় ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে জনগণের সমর্থন ভাঙতে অর্থনৈতিক জীবনকে দুর্বল করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। নথিতে বলা হয়েছিল, কিউবায় অর্থ ও পণ্য প্রবাহ বন্ধ করতে হবে যাতে ক্ষুধা ও হতাশা তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত সরকার পতন ঘটে।
নিষেধাজ্ঞার বিস্তার
১৯৭০-এর দশকে গড়ে বছরে প্রায় ১৫টি দেশ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল। ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩০-এ। আর বর্তমানে, ২০২০-এর দশকে নিষেধাজ্ঞার শিকার দেশ সংখ্যা ৬০-এরও বেশি।
ইরাক থেকে ভেনেজুয়েলা
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ১৯৯০-এর দশকে ইরাকের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি করেছিল। অপুষ্টি, বিশুদ্ধ পানির সংকট, ওষুধ ও বিদ্যুতের অভাব দেখা দেয়। সাম্প্রতিক উদাহরণ ভেনেজুয়েলা, যেখানে ২০১৭-২০১৮ সালে আরোপিত নিষেধাজ্ঞায় অতিরিক্ত ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে।
এই প্রসঙ্গে আল-জাজিরায় এক যৌথ মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছেন ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক জেসন হিকেল, ম্যাকুয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো ডিলান সুলিভান এবং গবেষক ওমর তাইয়্যেব। তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বহুদিন ধরে একতরফা নিষেধাজ্ঞাকে সাম্রাজ্যবাদী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। এর মাধ্যমে তারা এমন সব সরকারকে শাস্তি দিতে চায়, যারা পশ্চিমা প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীন পথ বেছে নিতে চায়।
বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার দাবি
তাঁরা বলছেন, পশ্চিমাদের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোকে (এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, ওশেনিয়া) নিজেদের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। যেমন—নিজেদের মুদ্রায় লেনদেন, দক্ষিণ-দক্ষিণ বাণিজ্য বাড়ানো, বিকল্প স্যাটেলাইট ও পেমেন্ট সিস্টেম গড়ে তোলা। ইতোমধ্যে চীন আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস), বাইদু স্যাটেলাইট এবং হুয়াওয়ের টেলিকম প্রযুক্তি দিয়ে বিকল্প পথ দেখাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবছর অর্ধ মিলিয়ন মানুষের প্রাণ নেওয়া এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা নির্ভর ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে একটি ন্যায্য ও বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
সুত্রঃ দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ সাময়িকী