কেপ ইয়র্কে অবৈধ নৌকায় প্রবেশের চেষ্টা, বিদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠাল অস্ট্রেলিয়া। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২ জুলাই- অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চলের কেপ ইয়র্ক উপদ্বীপে অবৈধভাবে নৌকায় প্রবেশের চেষ্টা করা একদল বিদেশি নাগরিককে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। একই ঘটনায় মানবপাচারের অভিযোগে দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ঘটনাকে ঘিরে অস্ট্রেলিয়ার সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবপাচার দমন এবং অভিবাসন নীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার ভোরে একটি নৌকা থেকে কয়েকজন বিদেশি নাগরিক কেপ ইয়র্ক উপদ্বীপের পেনিফেদার নদীর মোহনা-সংলগ্ন সমুদ্রসৈকতে অবতরণ করেন। এলাকাটি জনপ্রিয় ক্যাম্পিং স্পট এবং উইপা শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত।
তবে নিরাপত্তার স্বার্থে নৌকায় কতজন ছিলেন কিংবা তারা কোন দেশের নাগরিক, সে বিষয়ে সরকার কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর উইপা শহরের একটি সুপারমার্কেটের গাড়ি পার্ক থেকে ৩৪ বছর বয়সী এক তাইওয়ানের নাগরিককে গ্রেপ্তার করে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ। অভিযুক্ত চিয়েন-ওয়েন পেংকে বৃহস্পতিবার কেয়ার্নস ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়।
তার বিরুদ্ধে পাঁচজনের বেশি ব্যক্তিকে জড়িয়ে সংঘটিত গুরুতর মানবপাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। আদালতে অভিযোগের বিষয়টি জানানো হলে একজন মান্দারিন ভাষার দোভাষীর মাধ্যমে পেং বলেন, “মানুষ পাচারের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।”
রাষ্ট্রপক্ষ তার জামিনের বিরোধিতা করে জানায়, জামিন পেলে তিনি আদালতে হাজির না হওয়া কিংবা সাক্ষীদের প্রভাবিত করার ঝুঁকি রয়েছে। আইনজীবী ছাড়া আদালতে হাজির হওয়া পেং জানান, এখনো তিনি পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা আইনি পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ পাননি।
আদালত তাকে বিচারিক হেফাজতে পাঠিয়েছেন। শুক্রবার আবারও তাকে আদালতে হাজির করা হবে।
একই ঘটনায় আরও ৩০ বছর বয়সী আরেক ব্যক্তির বিরুদ্ধেও একই ধরনের মানবপাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। তাকে শুক্রবার কেয়ার্নস ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হবে।
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক এক বিবৃতিতে বলেন, উইপাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত অভিযান ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
তিনি বলেন, “ভিসা ছাড়া অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশের চেষ্টা করা প্রত্যেক ব্যক্তিকে দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যারা তাদের সহায়তা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনের সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, গত এক দশকেরও বেশি সময়ে কোনো মানবপাচার চক্র অস্ট্রেলিয়ায় অবৈধভাবে মানুষ প্রবেশ করাতে সফল হয়নি।
কেপ ইয়র্ক উপদ্বীপ ও টরেস প্রণালি অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বকারী সরকারি দলের সংসদ সদস্য ম্যাট স্মিথ জানান, নৌকায় আসা ব্যক্তিদের আটক রেখে প্রক্রিয়াজাত করার পর তাদের দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে তারা কোন দেশের নাগরিক, সে তথ্য প্রকাশ করেননি।
তিনি বলেন, মানবপাচারকে ব্যবসায় পরিণত করা ব্যক্তিদের কাছে অস্ট্রেলিয়ার বার্তা স্পষ্ট, “অস্ট্রেলিয়ার জলসীমায় আপনাদের কোনো স্থান নেই। অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করলে শেষ পর্যন্ত কোনো সুবিধাই পাবেন না।”
চলতি বছরের শুরুতে উত্তর কুইন্সল্যান্ড উপকূলে অবৈধ বিদেশি মাছ ধরার নৌকার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অস্ট্রেলিয়ান সীমান্ত বাহিনী বিশেষ অভিযান শুরু করে। ম্যাট স্মিথ জানান, তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন যাতে সেই অভিযান টরেস প্রণালির পাশাপাশি কেপ ইয়র্ক উপদ্বীপ এবং কার্পেন্টারিয়া উপসাগর এলাকাতেও সম্প্রসারণ করা হয়।
এদিকে কুইন্সল্যান্ড সরকার এবং বিরোধী জোট ফেডারেল সরকারের সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমালোচনা করেছে। তাদের দাবি, স্কুলের ছুটিতে ক্যাম্পিং করতে আসা কিছু মানুষ ঘটনাটি দেখতে না পেলে অবৈধ অনুপ্রবেশের বিষয়টি হয়তো ধরা পড়তই না।
তবে ম্যাট স্মিথ বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তায় সাধারণ মানুষের তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘ উপকূলজুড়ে প্রতি ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার অন্তর টহল নৌকা মোতায়েন করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই স্থানীয় বাসিন্দা ও সাধারণ মানুষের দেওয়া তথ্যই অনেক সময় সবচেয়ে কার্যকর নজরদারি হিসেবে কাজ করে।
কুইন্সল্যান্ডের পুলিশমন্ত্রী ড্যান পার্ডি বলেন, এই অভিযানে কুইন্সল্যান্ড পুলিশের ভূমিকা ছিল অবৈধভাবে তীরে ওঠা ব্যক্তিদের আটক করতে সহায়তা করা।
তিনি অভিযোগ করেন, কুক এলাকার রাজ্য সংসদ সদস্য ডেভিড কেম্পটন দীর্ঘদিন ধরেই উত্তর সীমান্তের নিরাপত্তা দুর্বল হওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে আসছিলেন। কিন্তু ফেডারেল সরকার সেই সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেয়নি।
ড্যান পার্ডির ভাষায়, অবৈধভাবে বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশের সঙ্গে জীবাণু নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি জড়িত। তার মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা সফল বলতে তখনই বোঝানো উচিত, যখন কোনো নৌকা উপকূলে পৌঁছানোর আগেই সেটিকে আটক করা সম্ভব হয়।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ