বাংলাদেশ

পড়ে আছে স্মৃতি, নেই মালিক: জেলায় জেলায় জমিদার বাড়ি

মতামত- সরদার সেলিম রেজা

  • 5:43 pm - July 02, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২০৮ বার
অযত্নে অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে বরুড়ায় জমিদার বাড়ি। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২ জুলাই- বাংলাদেশের ৬৪ জেলার যে কোনো গ্রামে ঢুকুন। ইউনিয়ন পেরিয়ে মেঠো পথ ধরলেই চোখে পড়বে বিশাল ইটের দেয়াল, ভাঙা নহবতখানা, শেওলা ধরা পুকুরঘাট আর জং ধরা লোহার গেট। এগুলো একসময়ের হিন্দু জমিদার বাড়ি। মালিক নেই, আছে শুধু স্মৃতি।

কতগুলো এমন বাড়ি?

সরকারি হিসাব নাই। কারণ অধিকাংশই “পরিত্যক্ত” তালিকায়ও নাই। তবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ২০১৮ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের প্রত্ননিদর্শন’ জরিপে বলেছে, সারাদেশে সংরক্ষণযোগ্য জমিদার-নবাব বাড়ি ও রাজবাড়ির সংখ্যা ৩৫৭টি।

বেসরকারি গবেষণা আরও ভয়াবহ। ‘বাংলাদেশ হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’ ২০২২ সালের মাঠ জরিপে বলছে, প্রতিটি জেলায় গড়ে ৫ থেকে ১২টি বড় জমিদার বাড়ি আছে। ছোট তালুকদার, মহাজন বাড়ি ধরলে সংখ্যাটা ২ হাজারের ওপরে।

অর্থাৎ, গড়ে প্রতি জেলায় কমপক্ষে ২/৩টি বড় হিন্দু জমিদার বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে।* মুন্সিগঞ্জে বালাসুর জমিদার বাড়ি, টাঙ্গাইলে ধনবাড়ি, নাটোরে দিঘাপতিয়া, কিশোরগঞ্জে পাগলা মসজিদের পাশের বাড়ি, বরিশালে গুঠিয়া, খুলনায় ভৈরবের পাশে। নাম ভিন্ন, গল্প এক।

কে ছিল তারা? কেন গেল?

১. ব্রিটিশ আমলের জমিদার: ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর বাংলার অধিকাংশ জমিদারি পায় হিন্দু মহাজন ও কায়স্থ সম্প্রদায়। ঢাকা নবাব, নাটোরের রাণী ভবানী, পুঠিয়া রাজবাড়ি, মহেড়া জমিদার বাড়ি—সবই এই সময়ের।

২. ১৯৪৭ এর ভাগ: দেশ ভাগের পর ভয় ও অনিশ্চয়তায় বহু হিন্দু জমিদার পরিবার কলকাতা, আগরতলা চলে যান। সম্পত্তি রেখে যান দায়িত্বপ্রাপ্ত নায়েব-মোক্তারের হাতে।

৩. ১৯৬৫ ও ১৯৭১: পাক-ভারত যুদ্ধের পর “শত্রু সম্পত্তি আইন”। ১৯৭৪ সালে “অর্পিত সম্পত্তি আইন”। ফলে যে হিন্দু মালিক দেশে ছিলেন না, তার জমি-বাড়ি রাষ্ট্রের খাতায় “অর্পিত” বা “ভিপি” হয়ে গেল।

৪. ২০০১ সালের আইন: “অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, ২০০১”। কিন্তু জটিল মামলা, কাগজের অভাবে ৯০% বাড়ি আজও মালিকহীন।

ফল: মালিক ভারতে। বাড়ি বাংলাদেশে। দেখার কেউ নাই।

আজকের অবস্থা: ধ্বংসের ৩টি চিত্র

চিত্র ১: দখল ও ভাঙন

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ২০২৩: তালিকাভুক্ত ৩৫৭টির মধ্যে ১৪২টি “চরম ঝুঁকিতে”। স্থানীয় প্রভাবশালীরা ইট খুলে নিয়ে যাচ্ছে। নাটোরের হালসা জমিদার বাড়ির ৭০% ইট এখন স্থানীয় পাকা বাড়ির দেয়ালে।

চিত্র ২: সরকারি ব্যবহার

অনেক বাড়ি এখন স্কুল, থানা, হাসপাতাল। ফরিদপুরের তালমা জমিদার বাড়ি এখন প্রাইমারি স্কুল। দেয়ালে পেরেক মেরে ব্ল্যাকবোর্ড। ইতিহাস ঢাকা পড়েছে সাদা রঙে।

চিত্র ৩: প্রকৃতির কবলে

বর্ষায় ছাদ ধসে, বটগাছের শেকড়ে দেয়াল ফাটে। রক্ষণাবেক্ষণের বাজেট নাই। ২০২৪-২৫ বাজেটে প্রত্নতত্ত্ব খাতে বরাদ্দ মাত্র ১২৮ কোটি টাকা। একটি মেট্রোরেল স্টেশনের খরচের ০.৫%।

এটা কি শুধু ইট-পাথরের ক্ষতি? না।

১. পর্যটনের ক্ষতি: রাজস্থানের জয়পুরের জমিদার বাড়ি বছরে ৩০ লাখ পর্যটক টানে। আমাদের নাটোরের দিঘাপতিয়া বছরে ৩০ হাজারও না। কারণ প্রচার নাই, রক্ষণাবেক্ষণ নাই। টিআইবি ২০২৩: ঐতিহ্য পর্যটন থেকে বাংলাদেশ বছরে হারাচ্ছে ২ হাজার কোটি টাকা।

২. সামাজিক সম্প্রীতির ক্ষতি: এই বাড়িগুলো শুধু হিন্দুর না। এখানে মুসলিম নায়েব কাজ করত, মুসলিম কারিগর ইট গাঁথত, মুসলিম কৃষক খাজনা দিত। এটা ছিল যৌথ বাংলার অর্থনীতি। আজ তা “হিন্দুর বাড়ি” বলে অবহেলায় পড়ে আছে।

৩. সাংস্কৃতিক স্মৃতিভ্রংশ:* জমিদার বাড়ির পাঠাগার, নাটমঞ্চ, দুর্গাপূজার মণ্ডপ—সবই ছিল গ্রামের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। সেগুলো গেলে গ্রামের গল্পও মরে যায়।

সমাধান কি? ৫ দফা প্রস্তাব

দফা ১: পূর্ণাঙ্গ জরিপ

৬ মাসে ৬৪ জেলায় ড্রোন ও জিআইএস ম্যাপিং করে “পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ি রেজিস্ট্রি” করতে হবে। নাম, বয়স, অবস্থা, দখলদার সব লিপিবদ্ধ।

দফা ২: “হেরিটেজ লিজ” মডেল

ভারতের রাজস্থান মডেল। সরকার ৯ বছরের লিজে দেবে বেসরকারি উদ্যোক্তাকে।

দফা ৩: মালিকের সাথে সমঝোতা

যেসব পরিবার ভারতে আছে, তাদের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি। তারা অর্থ দেবে, আমরা রক্ষণ করব। নামফলক থাকবে “মুখার্জি বাড়ি”। এটা সম্প্রীতির বার্তা দেবে।

দফা ৪: স্থানীয় কমিটি

প্রতি উপজেলায় “জমিদার বাড়ি রক্ষা কমিটি”। সভাপতি ইউএনও, সদস্য ইতিহাসের শিক্ষক, সাংবাদিক ও তরুণরা। দখল দেখলে সরাসরি ব্যবস্থা।

দফা ৫: বাজেট বাড়ানো

প্রত্নতত্ত্ব বাজেট কমপক্ষে ৫০ কোটি। ১২ হাজার কোটির মেগা প্রকল্পের ৪%। কারণ ইটের চেয়ে ইতিহাস দামি।

সত্যিটা হলো: জমিদার চলে গেছেন। জমি রয়ে গেছে। বাড়ি রয়ে গেছে। স্মৃতি রয়ে গেছে।

এই স্মৃতিগুলো ভাঙলে আমরা নিজেদের শেকড়ই ভেঙে ফেলি। কারণ বাংলাদেশের ইতিহাস শুধু মসজিদ-মাদ্রাসার না। মন্দির-জমিদার বাড়িরও।

সরদার সেলিম রেজা। ছবিঃ সংগৃহীত

লেখক- সরদার সেলিম রেজা; রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পরিবেশ কর্মী, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি: বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র।

এই শাখার আরও খবর

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আদিবাসী শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের দাবি

মেলবোর্ন, ২০ আগষ্ট- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আদিবাসী শিক্ষার্থীকে নিজ মেসে মারধর এবং জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে। বুধবার (১৯ আগস্ট) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের…

পারস্পরিক আস্থা ও মর্যাদাপূর্ণ আমন্ত্রণ না হলে ভারতে প্রধানমন্ত্রীর সফরের সম্ভাবনা কম: উপদেষ্টা

মেলবোর্ন, ২০ আগষ্ট- বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগামী মাসে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত সফরের সম্ভাবনা এখনো ‘ক্ষীণ’। দুই দেশের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে পারস্পরিক…

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ যুক্ত হলে কী বদলাবে, কেন উদ্বিগ্ন ভারত?

মেলবোর্ন, ২০ আগষ্ট- সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে মক্কা চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই তুরস্কের সংবাদমাধ্যম ইয়েনি শাফাক একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ওই চুক্তিতে যুক্ত করার সম্ভাবনা…

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

মেলবোর্ন, ২০ আগষ্ট- দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে…

ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ, নতুন চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ চায় বাংলাদেশ

মেলবোর্ন, ২০ আগষ্ট- ভারতের সঙ্গে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। এর আগে নতুন চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশকে গঙ্গার…

বিক্ষোভে অচল যাদবপুর, পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে এবিভিপি

মেলবোর্ন, ২০ আগষ্ট- ভারতের পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার দিনভর উত্তেজনা বিরাজ করেছে। পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি)…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au