যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ।ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২ জুলাই- যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরে ২০২৫ সালে যে পরিমাণ আয় করেছেন, তা দেশটির ইতিহাসে কোনো বর্তমান বা সাবেক প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রেই আগে দেখা যায়নি। নতুন প্রকাশিত বাধ্যতামূলক আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, হোয়াইট হাউসে ফেরার প্রথম বছরেই ট্রাম্পের মোট আয় দাঁড়িয়েছে অন্তত ২২০ কোটি ডলার। ইতিহাসবিদদের মতে, এই বিপুল আয় শুধু নতুন রেকর্ডই গড়েনি, বরং মার্কিন প্রেসিডেন্টদের দীর্ঘদিনের স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
মার্কিন ইতিহাসে প্রেসিডেন্টদের ব্যক্তিগত আর্থিক স্বার্থ ও সরকারি দায়িত্বের মধ্যে স্পষ্ট দূরত্ব বজায় রাখার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩তম প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান দায়িত্ব ছাড়ার পর সেনাবাহিনী থেকে পাওয়া মাসিক মাত্র ১১৩ ডলারের পেনশনের ওপর নির্ভর করতেন। তিনি একবার লিখেছিলেন, প্রেসিডেন্ট পদের মর্যাদা ও সম্মানকে কখনো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা উচিত নয়।
একইভাবে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ দায়িত্ব গ্রহণের আগে নিজের সব বিনিয়োগ একটি স্বাধীন “ব্লাইন্ড ট্রাস্ট”-এর অধীনে হস্তান্তর করেছিলেন, যাতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ব্যক্তিগত আর্থিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরকারি নীতির কোনো সম্পর্ক না থাকে। এমনকি ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদের ওপর কী প্রভাব ফেলেছিল, সেটিও তিনি জানতেন না বলে দায়িত্ব ছাড়ার সময় জানিয়েছিলেন।
কিন্তু ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সীমারেখা অনেক ক্ষেত্রেই অস্পষ্ট হয়ে গেছে। তাঁর বিভিন্ন ব্যবসা, বিশেষ করে ক্রিপ্টোকারেন্সি, গলফ রিসোর্ট ও আবাসন খাত থেকে বিপুল আয় হয়েছে, যার একটি অংশ সরকারি নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত খাত থেকেই এসেছে।
ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলার সেন্টারের ইতিহাসবিদ বারবারা পেরি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন নজির আগে কখনো দেখা যায়নি। তাঁর ভাষায়, অতীতে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের আর্থিক কর্মকাণ্ড এই পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
সরকারি নৈতিকতা দপ্তরে জমা দেওয়া ২০২৫ সালের আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ট্রাম্পের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল ক্রিপ্টোকারেন্সি খাত। শুধু এই খাত থেকেই তিনি প্রায় ১৪০ কোটি ডলার আয় করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ও তাঁর ছেলেদের যৌথভাবে প্রতিষ্ঠিত ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল থেকে তাঁর নিয়ন্ত্রিত কোম্পানিগুলো প্রায় ৮০ কোটি ডলার পেয়েছে। এর মধ্যে ক্রিপ্টো টোকেন বিক্রি থেকে এসেছে ৫২ কোটির বেশি ডলার এবং প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রি থেকে এসেছে আরও ২৫ কোটির বেশি ডলার।
এ ছাড়া নিজের নামে চালু করা “ট্রাম্প মিম কয়েন” বিক্রি করেও তিনি প্রায় ৬৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার আয় করেছেন।
মাত্র এক বছর আগেও একই প্রতিষ্ঠানের টোকেন বিক্রি থেকে ট্রাম্পের আয় ছিল প্রায় ৫ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। সর্বশেষ বিবরণীতে দেখা গেছে, সেই আয় এক বছরের ব্যবধানে প্রায় নয় গুণ বেড়েছে।
রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ট্রাম্প পরিবারের বিভিন্ন ক্রিপ্টো প্রকল্প থেকে মোট আয় ইতোমধ্যে ২৩০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প এমন একাধিক নীতি গ্রহণ করেছেন, যা ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবসাও উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হয়েছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সির পাশাপাশি আইনি সমঝোতা থেকেও বড় অঙ্কের অর্থ আয় করেছেন ট্রাম্প। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে মামলার নিষ্পত্তির মাধ্যমে তিনি ৮ কোটি ডলারের বেশি পেয়েছেন। এছাড়া বিদেশি আবাসন প্রকল্পে নিজের প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে আরও প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ ডলার আয় করেছেন।
তবে ক্রিপ্টো ব্যবসার বাইরে ট্রাম্পের গলফ কোর্স ও বিলাসবহুল রিসোর্টগুলোও শক্তিশালী আয়ের উৎস হিসেবে রয়েছে। ২০২৫ সালে এই খাত থেকে তাঁর আয় ১৫ শতাংশ বেড়ে ৫০ কোটি ডলারের বেশি হয়েছে।
বিশেষ করে ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর উপস্থিতি বাড়ায় আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে এই রিসোর্ট থেকে প্রায় ৫ কোটি ডলার আয় হয়েছিল, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ কোটি ৭০ লাখ ডলারে। একই সময়ে ওয়েস্ট পাম বিচ গলফ ক্লাবের আয়ও ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে লস অ্যাঞ্জেলেসের গলফ কোর্স থেকে আয় কিছুটা কমেছে।
আর্থিক বিবরণীতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, গত বছর ট্রাম্প চার্লস শোয়াব ব্যাংক থেকে ৫ কোটি ডলারের বেশি ঋণ নিয়েছেন। তবে সেই ঋণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে তাঁর আবাসন ব্যবসা থেকে আয় বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক ধীর ছিল। নিউইয়র্কের ট্রাম্প টাওয়ারসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক ভবন থেকে আয়ের তথ্য দেওয়া হলেও নির্দিষ্ট ভাড়ার পরিমাণ প্রকাশ করা হয়নি। বেশির ভাগ সম্পত্তির আয় গত এক দশকের তুলনায় প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে অথবা কিছু ক্ষেত্রে কমেছে।
এদিকে ট্রাম্পের বিপুল আয় এবং সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাঁর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নেওয়া কিছু নীতি তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবসার জন্যও লাভজনক হয়েছে, যা সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন তুলছে।
তবে হোয়াইট হাউস এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি এক বিবৃতিতে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বা তাঁর পরিবার কখনোই স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ডে জড়াননি। তিনি দাবি করেন, প্রশাসনের সব সিদ্ধান্তই যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করেই নেওয়া হয়েছে।
হোয়াইট হাউস আরও জানিয়েছে, ট্রাম্পের পারিবারিক ব্যবসাগুলো বর্তমানে তাঁর সন্তানদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। যদিও আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, এসব ব্যবসা থেকে অর্জিত আয়ের প্রধান সুবিধাভোগী এখনো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই।