আশা ভোসলে। ছবিঃ
শিল্পীর ফেসবুক থেকে
মেলবোর্ন, ৮ সেপ্টেম্বর- ভারতীয় সংগীতজগতের এক অনন্য কিংবদন্তি আশা ভোসলে আজ ৯২ বছরে পা দিলেন। অর্ধশতকের বেশি সময় ধরে লক্ষ লক্ষ শ্রোতার হৃদয়ে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন তাঁর অসংখ্য জনপ্রিয় গানের মাধ্যমে। আর ডি বর্মনের সঙ্গে তাঁর যুগলবন্দী বলিউড সংগীতে আলাদা এক অধ্যায় রচনা করেছে। সেই অধ্যায়ের সোনালি স্মৃতি ঘিরে আছে একেকটি গান, যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ‘তিসরি মঞ্জিল’ ছবির গান ‘আজা আজা ম্যায় হুঁ পেয়ার তেরা’। এ গানের পেছনের কাহিনি যেন নিজেই এক সিনেমা।
১৯৮৪ সালে ফিল্মফেয়ারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আর ডি বর্মন স্মৃতিচারণ করে বলেন, নাসির হুসেনের প্রযোজনায় ‘তিসরি মঞ্জিল’-এর সুরকার হিসেবে প্রথমে তাঁর নাম প্রস্তাব করেছিলেন গীতিকার মজরুহ সুলতানপুরী। ছবিতে মূল নায়ক হিসেবে ছিলেন দেব আনন্দ, কিন্তু মতবিরোধের কারণে পরে আসেন শাম্মি কাপুর। সমস্যায় পড়েন আর ডি, কারণ শাম্মির পছন্দের সুরকার ছিলেন শংকর-জয়কিশন।
‘শাম্মি তখন ছিলেন রাজাদের মতো। তাঁর নিজস্ব একটা গ্রুপ ছিল। তাই ভেবেছিলাম, আমার সুযোগ শেষ। একদিন শাম্মি এসে বললেন, “এই পঞ্চম, গান শোনাও।” আমি প্রথমে “দেওয়ানা মুঝসা নাহি” বাজালাম। শাম্মি উঠে বললেন, “এ কেমন গান!” তখন নাসির সাব ভেবেছিলেন, ছবিই শেষ। কিন্তু আমি যখন বাজালাম “আজা আজা ম্যায় হুঁ পেয়ার তেরা”, শাম্মি উঠে নাচতে শুরু করলেন। এভাবেই ছবির সুর করার অনুমতি পেলাম।’
আশার অনুশীলন আর ড্রাইভারের বিভ্রান্তি
গানটি প্রথম শোনানো হয় আশা ভোসলেকে। বিশেষ করে ‘আহ আহ আজা, আহ আহ আজা’ অংশটির জন্য অসাধারণ শ্বাসনিয়ন্ত্রণ দরকার ছিল। নিখুঁতভাবে গাইতে গিয়ে তাঁকে টানা আট দিন ধরে অনুশীলন করতে হয়েছিল।
এই সময়েই ঘটে এক মজার ঘটনা। অনুশীলনের সময় আশার শ্বাসপ্রশ্বাস এতটাই অস্বাভাবিক মনে হচ্ছিল যে তাঁর ড্রাইভার আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি ভেবেছিলেন, আশা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তখন তিনি জিজ্ঞেস করেন,
‘ম্যাডাম, হাসপাতাল যাবেন?’
কিন্তু পরে জানা গেল, সেটিই ছিল বিখ্যাত ‘আজা আজা’র মূল সুরের জন্য প্রস্তুতি।
গানটিকে নিখুঁত করার চিন্তায় আশা একদিন বোন লতা মঙ্গেশকরের কাছে যান। লতা তাঁকে আত্মবিশ্বাস জোগান এই বলে—
‘তুমি ভুলে যাচ্ছ যে তুমি প্রথমে মঙ্গেশকর, পরে ভোসলে। গান গাও, ভালোই হবে।’
এই কথাই আশাকে শক্তি দেয় এবং তিনি সাফল্যের সঙ্গে গানটি রেকর্ড করেন।
আশা-আর ডি বর্মনের যুগলবন্দী মানেই অগণিত জনপ্রিয় গান—‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘আও না গলে লাগাও না’, ‘ও হাসিনা জুলফোঁওয়ালি’—যা আজও কোটি কোটি শ্রোতার মুখে মুখে ফিরছে। এক সাক্ষাৎকারে আশা বলেছিলেন,
‘পঞ্চম নিজেই বলতেন, তুমি যদি আমার গান না গাও, আমি এসব গান বানানো বন্ধ করে দেব। তখন গিয়ে করব ভজন-কীর্তন।’
কারণ, তাঁর মতে, অন্য কোনো শিল্পীর কণ্ঠে তাঁর সুর এতটা প্রাণবন্ত হয়ে উঠত না।
দীর্ঘদিনের এই সুরেলা জুটি অবশেষে ১৯৮০ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৯৪ সালে আর ডি বর্মনের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁরা ছিলেন একে অপরের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী।
আজ ৯২ বছরে পা দিয়েও আশা ভোসলে শুধু একজন গায়িকা নন, বরং ভারতীয় সংগীতের জীবন্ত ইতিহাস। তাঁর গাওয়া প্রতিটি গান প্রমাণ করে—একজন শিল্পীর অধ্যবসায়, প্রতিশ্রুতি আর ভালোবাসা কিভাবে কোটি মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকে।