জো’স সী ফুড, প্রাইম স্টেক অ্যান্ড স্টোন ক্র্যাব রেস্তোরাঁর ফটকের সামনে ট্রাম্প, জেডি ভ্যান্স, পিট হেগসেথ ও মার্কো রুবিও। ছবি: এএফপি
মেলবোর্ন, ১২ সেপ্টেম্বর- নিরাপত্তাজনিত কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সচরাচর সাধারণ রেস্তোরাঁয় গিয়ে খাবার খান না। তবে গত মঙ্গলবার এক বিরল ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের কাছেই জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ “জো’স সী ফুড, প্রাইম স্টেক অ্যান্ড স্টোন ক্র্যাব”-এ নৈশভোজে যান। কিন্তু এ যাত্রা একেবারেই সুখকর হয়নি তার জন্য।
কারণ, আগে থেকেই সেখানে অপেক্ষা করছিলেন একদল বিক্ষোভকারী। তারা ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে ‘একালের হিটলার’ বলে শ্লোগান দিতে থাকেন এবং ফিলিস্তিনের পতাকা উঁচিয়ে ধরেন।
রেস্তোরাঁয় ট্রাম্পের গাড়িবহর এসে পৌঁছালে একদল মানুষ তাকে করতালি দিয়ে স্বাগত জানান। কিন্তু অন্যদিকে ভিন্ন চিত্র—ইসরায়েলের গাজায় গণহত্যামূলক আগ্রাসনে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অন্ধ সমর্থনের প্রতিবাদ জানাতে উপস্থিত ছিলেন ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনকারীরা।
সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, রেস্তোরাঁয় প্রবেশের পর ট্রাম্প কয়েকজন গ্রাহকের সঙ্গে হাত মেলান। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে বিক্ষোভকারীরা তার মুখোমুখি দাঁড়ান এবং শ্লোগান তুলতে থাকেন—
“ডিসিকে মুক্ত করো, ফিলিস্তিনকে মুক্ত করো, ট্রাম্প হচ্ছেন একালের হিটলার।”
ট্রাম্প প্রথমে হাত নেড়ে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করলেও তাদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। পরে নিরাপত্তারক্ষীদের ইঙ্গিত দিলে সিক্রেট সার্ভিস সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের একে একে বের করে দেন। এ সময় তারা বলতে থাকেন, “যাওয়ার সময় হয়েছে, এখন চলে যাওয়ার সময়।”
রেস্তোরাঁর বাইরে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন,
“গত ২০ বছর ধরে ওয়াশিংটন ডিসি অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল। কিন্তু গত এক বছরে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে—এখন এখানে কার্যত কোনো অপরাধই নেই।”
তিনি আরও যোগ করেন, “এক মাস আগেও আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস পেতাম না। এখন মানুষ নির্ভয়ে রেস্তোরাঁয় আসছে, ব্যবসা জমজমাট।”
নৈশভোজে ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস এবং প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট।
প্রেস সচিব জানিয়েছেন, ওই রাতে প্রেসিডেন্ট কাঁকড়া, চিংড়ি, সালাদ, স্টেক ও ডেজার্ট খেয়েছেন। রাত ১০টার পর ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরেন।
সিবিএস নিউজ জানায়, ওয়াশিংটনে অবস্থানকালে সাধারণত হোয়াইট হাউসের বাইরে বের না হওয়ায় প্রেসিডেন্টের এ ধরনের জনসমক্ষে নৈশভোজ বিরল ঘটনা।
ঘটনার পেছনে আরেকটি প্রেক্ষাপটও রয়েছে। গত ৭ আগস্ট থেকে ফেডারেল সরকারের নেতৃত্বে ওয়াশিংটন ডিসিতে বড় ধরনের অভিযান শুরু হয়েছে। এতে অংশ নিচ্ছে একাধিক নিরাপত্তা সংস্থা। লক্ষ্য—নগরীর গৃহহীনতা, সহিংস অপরাধ ও সংশ্লিষ্ট সমস্যা সমাধান।
কিন্তু এই অভিযানে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও দমন-পীড়নের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা বলছেন, সামরিক ও পুলিশি উপস্থিতিতে শহরের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
ট্রাম্প বরাবরই দাবি করে আসছেন, তার উদ্যোগে শহর ‘কেন্দ্রীয়করণ’ হচ্ছে এবং অপরাধ কমেছে। সমালোচকেরা বলছেন, ডেমোক্র্যাট শাসিত শহরগুলোতে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চাচ্ছেন তিনি।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ডিসিতে চলমান অভিযানে ইতোমধ্যে দুই হাজার ২০০ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে লস অ্যাঞ্জেলসেও ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেছিলেন ট্রাম্প। তিনি বাল্টিমোর, নিউ অরলিন্স ও শিকাগোসহ একাধিক ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত শহরে সেনা পাঠানোর হুমকিও দিয়েছেন।
সবচেয়ে বিতর্কিত পদক্ষেপ হলো, সম্প্রতি প্রতিরক্ষা দপ্তরের নাম পরিবর্তন করে ‘যুদ্ধ দপ্তর’ করার আদেশ দেওয়া। যদিও বিষয়টি এখনো কংগ্রেসের অনুমোদনের অপেক্ষায়।
এ নিয়ে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট গভর্নর জেবি প্রিৎজকার সরাসরি মন্তব্য করেছেন—
“ট্রাম্প একনায়ক হতে চাইছেন।”
ওয়াশিংটনের রেস্তোরাঁয় এক সন্ধ্যার নৈশভোজকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই নাটকীয় পরিস্থিতি আবারও প্রমাণ করল, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি কতটা উত্তপ্ত। সমর্থকরা যেমন তাকে করতালিতে অভ্যর্থনা জানান, সমালোচকরা তেমনি তাকে ‘একের হিটলার’ আখ্যা দিয়ে রাস্তায় নামেন।