বাজেট ২০২৬-২৭ ,প্রতীকী ছবি
মেলবোর্ন,২ জুলাই- নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতির মাধ্যমে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের যাত্রা শুরু হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন, মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতে, উচ্চ সুদের হার, ব্যাংকিং খাতের সংকট, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মতো বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করলে এসব লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।
৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে সরকার বেসরকারি বিনিয়োগকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঘোষিত ‘থ্রি আর’ বা রিকভারি, রিস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন কৌশলের মাধ্যমে ব্যবসা সহজীকরণে একাধিক সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থার মাধ্যমে সাত দিনের মধ্যে লাইসেন্স প্রদান, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোম্পানি নিবন্ধন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ১০ দিনের মধ্যে ভিসা প্রদান, প্লাগ অ্যান্ড প্লে শিল্প সুবিধা, গ্রিন চ্যানেলের মাধ্যমে দ্রুত পণ্য খালাস, কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর, আইপিও প্রক্রিয়া সহজীকরণ, করপোরেট বন্ড বাজার সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে বন্ড, সুকুক ও অবকাঠামো তহবিলের ব্যবহার বৃদ্ধি।
সরকারের প্রত্যাশা, এসব সংস্কার বাস্তবায়িত হলে ব্যবসার ব্যয় ও সময় কমবে, প্রশাসনিক জটিলতা দূর হবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।
কর্মসংস্থানে বড় পরিকল্পনা
নতুন বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বছরে ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান, বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান, ক্রিয়েটিভ ইকোনমিতে আরও ৫ লাখ কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ৩ লাখ ৭০ হাজার শ্রমিকের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
এ ছাড়া গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে ৪৫ হাজার নারীর কর্মসংস্থান, হাইটেক পার্কে ১৫ হাজার নতুন চাকরি, ২ লাখ ২০ হাজার তরুণকে উচ্চ দক্ষতার প্রশিক্ষণ, এসএমই খাতে ২ হাজার কোটি টাকার সহজ ঋণ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ চালু, ফ্রিল্যান্সিং ও স্টার্টআপ খাতে প্রশিক্ষণ এবং প্রবাসী কর্মসংস্থান বাড়াতে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আগামী পাঁচ বছরে জিডিপিতে আইসিটি ও টেলিকম খাতের অবদান ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে করমুক্ত রাখা এবং বছরে ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বন্ধ শিল্পকারখানা চালুতে ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল
গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যাংকিং খাতের সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের ঘোষণা দিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণা, এই তহবিল কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রপ্তানিতে নতুন গতি ফিরবে।
তবে ব্যবসায়ীরা সতর্ক করে বলেছেন, অতীতের মতো এই তহবিল যেন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে না গিয়ে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিনিয়োগের পথে বড় বাধা রয়ে গেছে
যদিও বাজেটে বিনিয়োগবান্ধব নানা ঘোষণা এসেছে, তবুও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি অনুকূলে নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদের হার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখায় ব্যাংক ঋণের সুদ দ্রুত কমার সম্ভাবনা নেই। ফলে অনেক উদ্যোক্তার জন্য নতুন বিনিয়োগে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অনিশ্চয়তা, ডলারের বাজারে চাপ, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের দায় এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অস্থিরতাও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, শুধু কর ছাড় দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা, উচ্চ সুদের হার, নীতিগত স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, ভূমি, বন্দর দক্ষতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদের মতে, রাজস্বনীতিতে বিনিয়োগবান্ধব পদক্ষেপ থাকলেও মুদ্রানীতিতে তার যথাযথ প্রতিফলন নেই। উচ্চ সুদের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ আরও ধীর হয়ে পড়তে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, শুধু বাজেট বা মুদ্রানীতির মাধ্যমে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাজার ব্যবস্থাপনায় সুশাসন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে টেকসই প্রবৃদ্ধির মূল শর্ত।
রাজস্ব আদায়ও বড় চ্যালেঞ্জ
নতুন অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের আদায়ের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জিত না হলে সরকারকে আরও বেশি ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে, যা বেসরকারি বিনিয়োগকে আরও সংকুচিত করবে।
বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
বিশ্লেষকদের মতে, বাজেট ও মুদ্রানীতিতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে, তার সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
তবে এসব সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে বাজেটের বড় বড় প্রতিশ্রুতি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। ফলে নতুন অর্থবছরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই, ঘোষিত নীতিগুলো কি সত্যিই নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করবে এবং টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, নাকি আগের মতোই বাস্তবতার বাধায় থমকে যাবে।