গত ১৩ মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অন্তত ১৩ বার নিন্দা জানিয়েছে। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৪ সেপ্টেম্বর- গত ১৩ মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অন্তত ১৩ বার নিন্দা জানিয়েছে। গড়ে মাসে অন্তত একবার। প্রতিবারই ভাষা প্রায় একই—“অন্তর্বর্তীকালীন সরকার … ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানায়।”
তালিকায় রয়েছে বহুবিধ ঘটনা। সর্বশেষ নিন্দা এসেছে রাজবাড়ীতে নুরুল হকের মরদেহ কবর থেকে তুলে জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনায়। এর আগে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নূরের ওপর হামলা, এনসিপি নেতাদের ওপর হামলা, সুফি দরগায় হামলা, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, জাতীয় পতাকা অবমাননা—প্রতিটি ঘটনায় সরকার বিবৃতি দিয়েছে।
প্রথমদিকে এসব বিবৃতি সাধারণ মানুষকে কিছুটা হলেও আশ্বস্ত করেছিল। মনে হয়েছিল, অন্তত সরকার চুপ করে নেই, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান জানাচ্ছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আশ্বাস উল্টো অস্বস্তিতে পরিণত হয়েছে।
কারণ, একের পর এক নিন্দার পরও বাস্তবে খুব বেশি পরিবর্তন দেখা যায়নি। ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পাননি। অপরাধীরা শাস্তি পায়নি। সহিংসতা বা অপরাধ প্রবণতা থামেনি।
প্রশ্নগুলো তাই থেকেই যাচ্ছে—এই নিন্দা জানানোর পর আসলে কী হয়?
নিন্দা: প্রতীক নাকি আতশবাজি?
নিন্দা জানানোর প্রক্রিয়া রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান জানানোর প্রথম ধাপ হতে পারে। কিন্তু যদি সেটি শুধু কথাতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এর কোনো বাস্তব মূল্য থাকে না। এটা তখন আতশবাজির মতো—আলো ঝলকানি আছে, শব্দ আছে, কিন্তু অন্ধকার ভেদ করে কোনো আলো পৌঁছায় না।
বিশ্বের অনেক দেশে কোনো ঘটনার পর নিন্দা জানানোর পাশাপাশি তদন্ত, বিতর্ক আর দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বাংলাদেশে নিন্দাই যেন চূড়ান্ত ধাপ। এরপর নীরবতা। অপরাধ ঘটে, বিবৃতি আসে, গল্প শেষ হয়ে যায়। ফলাফল: বিশ্বাস হারানো
এই ধারাবাহিকতার কারণে তিনটি বড় সমস্যা তৈরি হচ্ছে—
প্রথমত, নাগরিক আস্থা ক্ষয়।
মানুষ বারবার শুধু কথার ফুলঝুরি দেখে, কাজ দেখে না। একসময় তারা এসব নিন্দার বাণীকে গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করে দেয়। অপরাধীরাও বিষয়টি বুঝে নেয়, এবং এটিকে দুর্বলতা হিসেবে ব্যবহার করে।
দ্বিতীয়ত, ভুক্তভোগীদের হতাশা।
যারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের কাছে এই নিন্দা এক ধরনের অপমানের মতো। একজন পরিবার হারালেন বা ঘরবাড়ি হারালেন, আর সরকারের প্রতিক্রিয়া কেবল—“আমরা তীব্র নিন্দা জানাই…”—এতে তাদের অসহায়ত্ব আরও বাড়ে।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক অবিশ্বাস।
বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও সংস্থা প্রশ্ন তোলে—বাংলাদেশ কি সত্যিই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তরিক? শুধু বিবৃতি দিয়ে দায় শেষ করা কি এক ধরনের ভান নয়?
বিশ্বাস হারাচ্ছে সরকার
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সবচেয়ে বড় মূলধন ছিল জনগণের বিশ্বাস। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ ভেবেছিল, তারা পুরনো রাজনীতির ধারা বদলে ফেলবে। অন্যায় হলে শুধু কথায় নয়, দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেই পুরনো গল্পই ফিরছে।
শাসন মানে শুধু নীতি ঘোষণা করা নয়, বরং আস্থা তৈরি করা। মানুষকে বিশ্বাস করানো যে সরকার তাদের রক্ষা করবে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে, মর্যাদা অটুট রাখবে। কিন্তু প্রতিটি নিন্দার বিবৃতি যেন উল্টো বিশ্বাস ক্ষয় করছে।
বাংলাদেশের নাগরিকরা এখন বিবৃতি নয়, ফলাফল দেখতে চায়। তারা চায় অপরাধীর শাস্তি, ভুক্তভোগীর সহায়তা এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। নিন্দা যদি কার্যকর পদক্ষেপে রূপ না নেয়, তাহলে প্রতিটি বিবৃতি সরকারের শক্তি নয়, বরং দুর্বলতার প্রতীক হয়ে দাঁড়াবে।
দৈনিক ডেইলি স্টারে প্রকাশিত সাজ্জাদ হোসেনের লেখা মতামতের সংক্ষিপ্ত সংকলন।