সুশীলা কারকিই নেপালের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী । ছবিঃ বিবিসি
মেলবোর্ন, ১৪ সেপ্টেম্বর- নেপালে দুর্নীতিবিরোধী ভয়াবহ বিক্ষোভ ও সরকার পতনের পর এখন নতুন করে সংসদ পুনর্বহালের দাবি তুলেছে দেশটির প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। শনিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) এক যৌথ বিবৃতিতে নেপালি কংগ্রেস, সিপিএন–ইউএমএল, মাওবাদী সেন্টারসহ আটটি রাজনৈতিক দল প্রেসিডেন্ট রাম চন্দ্র পৌডেলের সিদ্ধান্তকে “অসাংবিধানিক” আখ্যা দিয়ে সংসদ পুনর্বহালের আহ্বান জানায়।
নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কারকির পরামর্শে শুক্রবার প্রেসিডেন্ট পৌডেল হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ ভেঙে দেন। এ পদক্ষেপকে অনেকেই বিক্ষোভকারীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি পূরণ হিসেবে দেখলেও রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, বিষয়টি সাংবিধানিক রীতির পরিপন্থী এবং নেপালের বিচার বিভাগের পূর্ববর্তী নজিরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
গত সপ্তাহে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রামসহ একাধিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ রূপ নেয় গণআন্দোলনে। দাঙ্গা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হন ৫০ জনেরও বেশি মানুষ। পরে চুক্তির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং দেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কারকি। সোমবার মধ্যরাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলেও আন্দোলন তখন আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে।
ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা রাজধানী কাঠমান্ডুতে সংসদ ভবনসহ একাধিক সরকারি স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে দেয়। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীপরিষদের কার্যালয় ‘সিংহ দরবার’। পরে সেনা সদস্যরা অগ্নিকাণ্ড থেকে বেঁচে যাওয়া আসবাব ও সরঞ্জাম নতুন কার্যালয়ে স্থানান্তর করেন।
একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগ করলেও রাস্তায় আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে বিক্ষোভকারীরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাঠমান্ডু উপত্যকায় সেনা মোতায়েন করা হয় এবং জারি করা হয় কারফিউ। নতুন প্রধানমন্ত্রী কারকির শপথের পর সেনারা ঘাঁটিতে ফিরে যায় এবং বেশিরভাগ এলাকায় কারফিউ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। তবে সংসদ ভবন, সিংহ দরবারসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সমাবেশ ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ রয়েছে।
৭৩ বছর বয়সী সুশীলা কারকি শপথ নেওয়ার পর আহতদের দেখতে হাসপাতালে যান এবং তাদের চিকিৎসা–সুবিধার খোঁজখবর নেন। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে ‘জেন–জি আন্দোলনের’ ছাত্রনেতারা কারকির নেতৃত্বকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য স্বাগত জানালেও তার মন্ত্রিসভার সামনে নানা চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে—
- আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা,
- ভস্মীভূত সংসদ ও সরকারি ভবন পুনর্নির্মাণ,
- পরিবর্তনকামী তরুণদের আস্থা অর্জন,
- দুর্নীতি ও রাজনৈতিক পরিবারের প্রভাব নিয়ে জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত করা।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট পৌডেল শনিবার সকল পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “খুব কঠিন পরিস্থিতিতেও একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে অগ্রগতি হচ্ছে। সংবিধান কার্যকর আছে, সংসদীয় ব্যবস্থা বিদ্যমান এবং আগামী ছয় মাসের মধ্যেই নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেপালের নবীন গণতন্ত্র আজ এক বড় পরীক্ষার মুখোমুখি। একদিকে সংসদ পুনর্বহালের দাবি, অন্যদিকে নির্ধারিত ৫ মার্চের জাতীয় নির্বাচন—এই দুই চাপের মধ্যে দিয়ে দেশটি কীভাবে স্থিতিশীলতার পথে ফিরবে, তা এখন দেখার বিষয়।
সূত্রঃ বিবিসি