মেলবোর্ন, ২১ সেপ্টেম্বর- জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখন জলবায়ু ঋণের বোঝায় শীর্ষে অবস্থান করছে। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান মাত্র শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ, অথচ বর্তমানে দেশে মাথাপিছু জলবায়ু ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৯ দশমিক ৬ মার্কিন ডলার। এ ঋণস্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।
শনিবার (২০ সেপ্টেম্বর) বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ প্রকাশিত ‘জলবায়ু ঋণ ঝুঁকি সূচক ২০২৫’ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণায় বলা হয়, প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে তার বড় অংশ আসছে ঋণ আকারে। ফলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো একসঙ্গে দুই দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—
একদিকে ঘনঘন জলবায়ুঘটিত দুর্যোগ ও অন্যদিকে ঋণ শোধের বাড়তি চাপ।
জলবায়ু অর্থায়নের ৭০ শতাংশেরও বেশি ঋণ আকারে দেওয়া হয়।বাংলাদেশের ঋণ-অনুদান অনুপাত ২.৭, যা এলডিসিগুলোর গড় (০.৭)-এর প্রায় চার গুণ।বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এমডিবি) থেকে নেওয়া বাংলাদেশের ঋণের অনুপাত ০.৯৪, যা বৈশ্বিক গড় (০.১৯)-এর প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।
২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগে বাংলাদেশে ১৩ কোটিরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩৬০ কোটি মার্কিন ডলার।এত কিছু সত্ত্বেও জলবায়ু অভিযোজন খাতে সহায়তা অত্যন্ত নগণ্য।
দেশের পরিবারগুলো জলবায়ুঘটিত বিপর্যয় থেকে সুরক্ষার জন্য প্রতি বছর গড়ে মাথাপিছু ১০ হাজার ৭০০ টাকা (প্রায় ৮৮ মার্কিন ডলার) নিজেদের অর্থ থেকে ব্যয় করছে। জাতীয় পর্যায়ে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭০ কোটি মার্কিন ডলার।
নীতি নির্ধারকদের বক্তব্য
- ফারহিনা আহমেদ, সচিব, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়:
“জীববৈচিত্র্য রক্ষা করলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমে। কিন্তু কপ সম্মেলনের মতো বৈশ্বিক ফোরামের বাস্তব ফল কম। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায়ে উল্লেখিত অসম কার্বন নিঃসরণ বিষয়ে বাংলাদেশকে সাড়া দিতে হবে।”
- জাকির হোসেন, প্রধান নির্বাহী, চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ:
“দৃঢ় অঙ্গীকার ও স্পষ্ট শাসনব্যবস্থা না থাকলে কপ-২৯-এ ঘোষিত ১ বিলিয়ন ডলারের ক্লাইমেট ফাইন্যান্স অ্যাকশন ফান্ড উচ্চাশাই হয়ে থাকবে।”
- ফজলে রাব্বি সাদেক, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পিকেএসএফ:
“ন্যায়ের ভিত্তিতে অনুদান না এলে বিশ্ব জলবায়ু ঋণ-সংকটে পড়তে পারে। তখন ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের বেঁচে থাকাই ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।”
- ফারিয়া হোসাইন ইকরা, গ্রিনস্পিকার, গ্রিনপিস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া:
“বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে। ফলে ন্যায়সঙ্গত জলবায়ু অর্থায়ন পাওয়া আরও কঠিন হবে। বড় নিঃসরণকারীদের জবাবদিহিতে আনতে আইসিজের মতামত আইনি হাতিয়ার হতে পারে।”
- কাজী শাহজাহান, যুগ্ম-সচিব, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি):
“জলবায়ু বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি ও মানব আচরণের সঙ্গে জড়িত। কার্যকর অর্থায়নের জন্য জাতীয়-আন্তর্জাতিক নীতিমালা বোঝা জরুরি এবং স্থানীয় সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।”
সার্বিকভাবে, গবেষণা ও আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে—জলবায়ু ক্ষতিপূরণ অনুদানের পরিবর্তে ঋণে পরিণত হওয়ায় বাংলাদেশ দ্বিগুণ ক্ষতির মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু ন্যায়বিচার না হলে এ সংকট শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠবে।