ভিক্টোরিয়ায় আদিবাসীদের সঙ্গে ঐতিহাসিক চুক্তির পথে অস্ট্রেলিয়া। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৩ সেপ্টেম্বর- ভিক্টোরিয়া রাজ্য ইতিহাস তৈরি করতে যাচ্ছে। কয়েক বছরের আলোচনার পর রাজ্য সরকার সংসদে একটি ঐতিহাসিক ট্রিটি বিল উত্থাপন করেছে। চলতি মাসেই বিলটি পাস হলে এটি ফার্স্ট পিপলস বা আদিবাসীদের প্রতি আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা, স্কুলে তাদের ইতিহাস অন্তর্ভুক্তি এবং পার্ক ও নদীনালায় ঐতিহ্যবাহী নাম ফিরিয়ে দেওয়ার পথ খুলে দেবে।
এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমান্তরালভাবে কাজ করছে ইউরুক জাস্টিস কমিশন, যা অস্ট্রেলিয়ার প্রথম আদিবাসী নেতৃত্বাধীন সত্য উদঘাটন কমিশন।
অস্ট্রেলিয়ার অতীত ও নতুন উদ্যোগ
কানাডা বা নিউজিল্যান্ডের মতো অস্ট্রেলিয়া কখনোই আদিবাসীদের সঙ্গে কোনো চুক্তি করেনি। টেরা নালিউস নামের আইনি কল্পকাহিনির ওপর ভিত্তি করে ব্রিটিশরা এই ভূমি দখল করেছিল, যেন এখানে কেউ নেই। এর ফলে ভূমি দখল, সহিংসতা এবং আদিবাসীদের মৌলিক অধিকার হরণ ঘটে।
বিগত কয়েক দশকে একাধিক তদন্ত ও কমিশন হলেও বাস্তব সংস্কার হয়নি। ২০২১ সালে ভিক্টোরিয়া অন্য পথ নেয়। ফার্স্ট পিপলস অ্যাসেম্বলি গঠন করে তারা সত্য উদঘাটন ও ট্রিটি প্রক্রিয়া একত্র করে। এর আওতায় ইউরুক কমিশন শত শত সাক্ষ্যগ্রহণ করেছে—গণহত্যা, শিশু অপহরণ, অতিরিক্ত পুলিশি তৎপরতা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য ও আবাসনে বৈষম্যের বিষয় পর্যন্ত।
ট্রিটি পরিকল্পনার কাঠামো
ট্রিটি উদ্যোগের মূল প্রতিষ্ঠান হবে গেল্লুং ওয়ার্ল (গুনাইকুরনাই ভাষায় “বর্শার অগ্রভাগ”)। এটি প্রতীকী নয়, বরং স্থায়ীভাবে ভিক্টোরিয়ার গণতান্ত্রিক কাঠামোর অংশ হবে। এর জন্য বছরে ৭ কোটি ডলারের বাজেট বরাদ্দ থাকবে, যা প্রতিবছর ২.৫% করে বাড়বে।
প্রতিষ্ঠানটির কাঠামোর মধ্যে থাকবে একটি স্থায়ী সত্য উদঘাটন সংস্থা, যা Yoorrook Justice Commission-এর কাজকে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এর পাশাপাশি থাকবে একটি Accountability Commission, যা সরাসরি মন্ত্রী, সরকারি দপ্তর ও বিভিন্ন প্রকল্পের কার্যক্রম তদারকি করবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির পরামর্শ ও তথ্য চাইবার ক্ষমতা থাকবে, যাতে নতুন করে প্রণীত যেকোনো আইন ট্রিটির নীতি ও চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ ও প্রকাশ করা যায়।
ফার্স্ট পিপলস অ্যাসেম্বলির নির্বাচিত সদস্যরা মন্ত্রিসভা, মন্ত্রী, সচিব এমনকি পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পাবেন। বছরে অন্তত একবার সংসদে ভাষণ এবং দুইবার মন্ত্রিসভা বৈঠকে অংশ নেবেন। এটি অস্ট্রেলিয়ায় নজিরবিহীন।
বিতর্ক ও ভারসাম্য
বিরোধীদল বলছে, ট্রিটি সংসদের সার্বভৌমত্ব খর্ব করতে পারে। তবে সরকার স্পষ্ট করেছে—এটি কোনো নতুন সংসদ গঠন, সংবিধান পরিবর্তন বা ব্যক্তিগত ক্ষতিপূরণ দেবে না। বরং যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সত্য উদঘাটন ও দায়বদ্ধতার কাঠামো তৈরি করবে।
সাবেক সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি কেভিন বেল বলছেন, বিলটির দুটি “সোনালি সুতোর” মতো দিক হলো—আদিবাসীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং সংসদের আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত ক্ষমতা বজায় রাখা।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
একবার ট্রিটি কার্যকর হলে প্রতিটি বিলের সঙ্গে ট্রিটি সামঞ্জস্য বিবৃতি যুক্ত করতে হবে, যেখানে উল্লেখ থাকবে ফার্স্ট পিপলস অ্যাসেম্বলির সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছে কি না। কোনো বিল ট্রিটির পরিপন্থী হলেও পাস হতে পারে, তবে তা রেকর্ডে থেকে যাবে।
নতুন দায়বদ্ধতা কাঠামো, যেমন Nginma Ngainga Wara (আদিবাসী প্রোডাক্টিভিটি কমিশন), সরকারের নীতি বাস্তব প্রভাব যাচাই করবে। এর মাধ্যমে আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় বাস্তব উন্নতি আশা করা হচ্ছে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রভাব
অন্য কয়েকটি রাজ্যে ট্রিটি প্রক্রিয়া ভেস্তে গেলেও ভিক্টোরিয়া এগিয়ে যাচ্ছে। এটি সফল হলে অন্য রাজ্যগুলোর জন্যও উদাহরণ হতে পারে। কানাডা ও নিউজিল্যান্ডের অভিজ্ঞতা দেখায়, চুক্তি বাস্তব জীবনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ন্যায়বিচারে পরিবর্তন আনতে পারে।
ভবিষ্যতের রূপকল্প
ট্রিটি সফল হলে প্রবীণদের আবাসন সমস্যার সমাধান, স্কুলে আদিবাসী ভাষা ও ইতিহাসের অন্তর্ভুক্তি, ভূমি ব্যবস্থাপনায় ঐতিহ্যবাহী মালিকদের অংশগ্রহণ—এসব বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
এটি কোনো জাদুর কাঠি নয়, ভবিষ্যতে সরকার চাইলে বাতিল বা সংশোধন করতে পারবে। তবুও এটি ভিক্টোরিয়াকে অতীতের ঔপনিবেশিক অবিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে এবং নতুন পথ দেখাচ্ছে। সফল হলে এটি শুধু ভিক্টোরিয়ায় নয়, পুরো অস্ট্রেলিয়ায় আদিবাসী আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ন্যায়বিচারের নতুন দিগন্ত খুলতে পারে।
সুত্রঃ The Conversation