জাতিসংঘে ড. ইউনূসের ভাষণ: বাস্তবতা আর মুখোশ
মেলবোর্ন ২৭ সেপ্টেম্বর- জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের দেওয়া ভাষণ আবারও প্রমাণ করেছে কীভাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে শব্দের ঝংকারে দেশের বাস্তবতাকে আড়াল করা যায়। তিনি বলেছেন, পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান এখনই বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ আসলে গাজা ইস্যুতে কী করেছে? মানবিক সহায়তা, কূটনৈতিক উদ্যোগ বা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ কোথায়? বক্তৃতায় আবেগ আছে, কিন্তু পদক্ষেপ নেই।
ভাষণে তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির কথা উল্লেখ করেছেন। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনের শাসনের সংস্কারের দাবি তুলেছেন। কিন্তু তিনি বলেননি যে নির্বাচন হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, মুক্ত ও সুষ্ঠু। কেবল একটি নিরাপদ এক্সিট তৈরিই যেন মূল লক্ষ্য। ইলেকশন কমিশন কেন নৌকার প্রতীক বাদ দিল, তা নিয়ে কোনো উত্তর নেই। জনগণ ভোট দেবে কি দেবে না, সেটা জনগণের সিদ্ধান্ত। অথচ জাতিসংঘের মঞ্চে তিনি এসব সত্য উচ্চারণের সাহস দেখাতে পারেননি।
তিনি বলেছেন বৈষম্যমুক্ত ও ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ গড়ার দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ ৫ আগস্টের পর কত মানুষ নিহত হয়েছে, কতজন জেলে বন্দি, মব ভায়োলেন্সে কত পরিবার ধ্বংস হয়েছে, জাতিগত সংখ্যালঘু নির্যাতন বাংলাদেশে থেমে থাকেনি, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী সব সম্প্রদায়ের উপর পৈশাচিক নির্যাতন দিনদিন বাড়ছেই, যা এই সরকারের পেটোয়া মব ও জঙ্গি বাহিনী চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের চলমান আইনি লড়াই আজ বাংলাদেশে ন্যায়বিচার, সাংবিধানিক অধিকার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দেশের মানুষ আজ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি মুছে দেওয়া হচ্ছে, অর্থনীতি ধ্বংসপ্রায় অবস্থায়। বাস্তবতা হলো গত এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্জন দৃশ্যমান কিছুই নেই।
আরেকটি বড় প্রশ্ন স্বচ্ছতা নিয়ে। ড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো অস্বাভাবিক দ্রুততায় সরকারি অনুমোদন ও বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে। গ্রামীণ ইউনিভার্সিটির অনুমোদন, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেসের জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স, গ্রামীণ টেলিকমের ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর অনুমতি—সবকিছুই তড়িঘড়ি সম্পন্ন হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংকের কর মওকুফ, সরকারের শেয়ার ২৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শ্রম আইন লঙ্ঘন ও অর্থপাচারের মামলা দ্রুত খারিজ হয়ে যাওয়া স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই বিষয় গুলো তো বিশ্ব প্রতিনিধিরা জানতে বা বুঝতে পারছেন না।
শান্তি, ন্যায়বিচার ও সংস্কারের আদর্শিক বুলি শুনতে ভালো লাগলেও দেশের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে গাজার নাম উচ্চারণ করে করতালি পাওয়া যায়, কিন্তু বাংলাদেশের ভেতরের দমন-পীড়ন, সুষ্ঠু নির্বাচনের অনিশ্চয়তা, আইনের শাসনের অভাব আর অর্থনৈতিক বিপর্যয়কে চেপে রাখা যায় না। ইতিহাস একদিন বিচার করবে, উচ্চকিত বক্তৃতা নয়, বরং দেশের মানুষের জন্য নিরাপত্তা, সত্যিকারের গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই আসল নেতৃত্বের প্রমাণ মেলে।