অর্থনৈতিক যুদ্ধ মোকাবিলায় টাস্কফোর্স গঠন করল ইরান
চলমান সংঘাতের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ টাস্কফোর্স গঠন করেছে ইরান। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে যুদ্ধের প্রভাব দ্রুত শনাক্ত করে তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ…
মেলবোর্ন, ৩০ সেপ্টেম্বর- দলীয় নেতাদের বিব্রতকর ছবি, ভিডিও ও অডিও ক্লিপ সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানোর বিষয়টি এখন বিএনপির জন্য বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একের পর এক এমন ঘটনা ঘটায় দলটির নেতারা মনে করছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রচারণা নয়, বরং পরিকল্পিত ও সংঘবদ্ধ সাইবার আক্রমণ। শুরুতে বিষয়টি তেমন গুরুত্ব না দিলেও জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এখন এটিকে বড় রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে দেখছেন।
নেট দুনিয়ার এই অপপ্রচার ঠেকাতে ও করণীয় নির্ধারণে দলীয় পর্যায়ে চলছে আলোচনাও। তবে বিএনপির আর্থিক সংকট ও সাংগঠনিক সমন্বয়হীনতার কারণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নির্বাচনের আগে ভার্চুয়াল জগতে দলটির বিরুদ্ধে আরও বড় আকারে গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়ানো হতে পারে।
বিএনপির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও সালাহউদ্দিন আহমেদসহ অনেক শীর্ষ নেতাকে লক্ষ্য করে মিথ্যা তথ্য, বিকৃত ভিডিও ও ব্যঙ্গ ফটোকার্ড ছড়ানো হচ্ছে। এতে বিভ্রান্ত হয়ে সংগঠনগত পদক্ষেপ নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, “আগে মানুষ মূলধারার সংবাদে ভরসা করত, এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় নির্ভর করছে। এখানে অপপ্রচার এখন রাজনৈতিক অস্ত্র। এআই প্রযুক্তি বিষয়টিকে আরও ভয়ংকর করেছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে নির্বাচনপূর্ব পরিবেশ ভয়াবহ হতে পারে।”
বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে পাঁচ থেকে ছয় কোটি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করেন, ইউটিউব দর্শক তিন কোটির বেশি। এদের বড় অংশ তরুণ প্রজন্ম, যাদের তথ্যপ্রবাহের মূল উৎস সামাজিক মাধ্যম।
বিএনপির আইটি সেলের দাবি, দীর্ঘ বিশ্লেষণে দেখা গেছে দলটির বিরুদ্ধে ছড়ানো গুজবের ৭০ শতাংশ ছড়ানো হচ্ছে ভারত থেকে (আওয়ামী লীগ ও জামায়াত-শিবির পৃথকভাবে সক্রিয়)। বাকি ৩০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক, রাশিয়া, চীন ও বাংলাদেশ। এসব দেশে অর্থের বিনিময়ে সফটওয়্যার ও বট ব্যবহার করে সংগঠিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
আইটি সেলের কর্মকর্তারা জানান, এসব অপপ্রচার ফেসবুক নিউজফিড, ইনবক্স ও গ্রুপের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। উন্নত সফটওয়্যার ব্যবহার করে কয়েক লাখ মানুষের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ফেসবুক বট বাহিনী তৈরি করে স্বয়ংক্রিয় কমেন্ট, লাইক ও শেয়ার দিয়ে গুজবকে সত্যের মতো দেখানো হচ্ছে।
বিএনপির আইটি সেলের এক কর্মকর্তা বলেন, “গুজব, ভুয়া তথ্য ও মিথ্যা প্রচারণা পুরোনো কৌশল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতে এটি ব্যবহার করত, এখন জামায়াত-শিবির সক্রিয়ভাবে করছে। তাদের সদস্যদের একাধিক ভুয়া আইডি আছে, যার মাধ্যমে সম্মিলিত আক্রমণ চালানো হয়।”
বিএনপির তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, “একটি মিথ্যা তথ্য বারবার শুনলে মানুষ সেটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। এটিই ‘ইল্যুশন অব ট্রুথ এফেক্ট’। তাই মিথ্যা বার্তা যত ঘন ঘন প্রচার হবে, তা ততই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।”
স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “সামাজিক মাধ্যমে প্রতিনিয়ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে গুজব তৈরি হচ্ছে। বিএনপির বিরুদ্ধে এভাবে সাইবার আক্রমণ চালানো হচ্ছে। সবাইকে সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় থেকে সত্য তুলে ধরতে হবে।”
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “সামাজিক মাধ্যম কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বরং জামায়াতের বিরুদ্ধেই অপপ্রচার চলছে। বিএনপি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ তুললে প্রমাণ দিতে হবে।”
বিএনপির আইটি সেলের কর্মকর্তারা জানান, দলের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে মাসে ৬ থেকে ৮ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ করা হচ্ছে, অথচ বিএনপির নিজস্ব বাজেট নেই। দলের তহবিল সংকটে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না। এক কর্মকর্তা বলেন, “নেতারা অনেকেই ধনাঢ্য, কিন্তু দল হিসেবে বিএনপি অর্থসংকটে ভুগছে।”
এ ছাড়া মিডিয়া সেল ও আইটি সেলের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকায় সমন্বয় ব্যাহত হচ্ছে। আগে আইটি সেলে থাকা ছাত্রদল ও যুবদলের দক্ষ তরুণরা স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করলেও এখন তাদের বাদ দিয়ে বাণিজ্যিক আইটি বিশেষজ্ঞদের আনা হয়েছে, ফলে আগের উদ্যম হারিয়েছে দলটি।
আইটি বিশ্লেষক সাইফুল ইসলাম শাকিল জানান, বিএনপির বিরুদ্ধে গুজব সাধারণত রাত ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে শুরু হয়। তখন অধিকাংশ নেতা ঘুমিয়ে পড়েন, ফলে কাউন্টার বার্তা দিতে সময় লেগে যায়। “গুজব প্রচারের আট ঘণ্টার মধ্যেই ফ্যাক্ট চেক ও পাল্টা পোস্ট দিতে পারলে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব,” বলেন তিনি।
তিনি আরও জানান, প্রচারণার গতি ঠেকাতে প্রচুর মানুষ একযোগে রিপোর্ট করলে ফেসবুক স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু বিএনপির অনলাইন কর্মীরা সক্রিয় না থাকায় সেই সুযোগ পাচ্ছেন না।
ওয়ান মল আইটি লিমিটেডের নির্বাহী ও আইটি বিশ্লেষক সাইফুর রহমান আসাদ জানান, এই অপপ্রচারগুলোতে ব্যবহৃত হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, গ্রিন স্ক্রিন, ডিপ ফেকসহ নানা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রযুক্তি। এগুলো এতটাই নিখুঁতভাবে তৈরি যে বাস্তব ও বানোয়াটের পার্থক্য বোঝা কঠিন।
তার মতে, অপপ্রচারকারীরা ভুয়া সংস্থা ও অনলাইন পোর্টাল খুলে প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের লোগো ও ডিজাইন ব্যবহার করছে, যাতে মিথ্যা খবরগুলো সত্য মনে হয়। ভয়েস ক্লোনিং সফটওয়্যারের মাধ্যমেও নেতাদের কণ্ঠ নকল করে স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী বক্তব্য তৈরি করা হচ্ছে।
সাইবার আক্রমণের এই জটিল ও সংগঠিত রূপ এখন বিএনপির রাজনীতিতে নতুন ধরনের চাপ তৈরি করেছে। দলটির ভেতরে আলোচনা চলছে, কীভাবে সীমিত সম্পদ ও দুর্বল অনলাইন উপস্থিতির মধ্যে এই ডিজিটাল লড়াইয়ে টিকে থাকা যায়।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au