অ্যানথ্রাক্স ভাইরাস। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২ অক্টোবর- বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা রংপুর ও আশপাশের জেলাগুলোতে আবারও অ্যানথ্রাক্স আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আইন অনুযায়ী মাংস বিক্রির আগে সিভিল সার্জনের দপ্তর থেকে স্বাস্থ্য সনদ এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে লাইসেন্স নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও অধিকাংশ মাংস ব্যবসায়ীর কাছে এসব নেই। অনেকে নিয়মটিই জানেন না, ফলে রোগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে। চিকিৎসক ও সচেতন মহল বলছেন, এই অব্যবস্থাপনা অ্যানথ্রাক্স পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সম্প্রতি রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার পর রোগটি ছড়িয়ে পড়ে পাশের গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায়। ওই এলাকাতেও মাংস ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স নেই এবং নিয়মিত পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় না। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৩৫টি স্থানে ৬০ থেকে ৬৫টি গরু ও ছাগল জবাই করা হয়।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ইমাদপুর ইউনিয়নে অসুস্থ গরুর মাংস থেকে অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে জবাই করা একটি গরুর মাংস থেকে সংগৃহীত নমুনায় রোগের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে আইইডিসিআর। ওই মাংস প্রক্রিয়াজাতের সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তি ও এক গৃহিণীর শরীরেও অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত সাতজনের উপসর্গ দেখা গেছে, যাদের মধ্যে দুজনের পরীক্ষায় ফল পজিটিভ এসেছে। আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
রোগ প্রতিরোধে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃপক্ষ গরু জবাইয়ের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, উঠান বৈঠক, লিফলেট বিতরণ ও টিকাদান কার্যক্রম চালাচ্ছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ, ভালোভাবে সিদ্ধ মাংস খেতে হবে এবং আক্রান্ত পশুর রক্ত-মাংসের সংস্পর্শ এড়াতে হবে।
সুন্দরগঞ্জ পৌর বাজার ইজারাদার ও মাংস ব্যবসায়ী শুকুর আলী বলেন, পৌরসভায় নিয়মিত পশু পরীক্ষা হয়, তবে উপজেলার বামনডাঙ্গা, রামগঞ্জ ও বেলকায় এই ব্যবস্থা নেই। বিশেষ করে রামগঞ্জ বাজারে বেশি অসুস্থ গরু জবাই করা হয়, আর সেসব মাংসই পাইকারি বিক্রি হয়ে অন্যান্য বাজারে ছড়িয়ে পড়ে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. বিপ্লব কুমার দে জানান, সুন্দরগঞ্জ পৌরসভা ও রামগঞ্জ বাজারের কসাইখানায় পরীক্ষা ছাড়া পশু জবাইয়ের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। তবে অন্যান্য বাজারেও নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।
একই চিত্র রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলাতেও দেখা গেছে। সেখানে ৬০ জনেরও বেশি মাংস ব্যবসায়ী রয়েছেন, কিন্তু কারো কাছে বৈধ লাইসেন্স নেই। জবাইয়ের আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করেই প্রতিদিন মাংস বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী হাসিনুর ইসলাম বলেন, “লাইসেন্স নিতে হয় এটা আগে জানতাম না। কয়েক দিন আগে শুনেছি। এখন লাইসেন্স নেব।”
চিকিৎসক ও সচেতন মহল বলছেন, অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত পশুর শ্লেষ্মা, লালা, রক্ত, মাংস, হাড় বা নাড়িভুঁড়ির সংস্পর্শে এলেই মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। এই রোগ পশু থেকে মানুষে ছড়ালেও মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে প্রথমে চামড়ায় ঘা দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গবাদিপশুকে নিয়মিত টিকা দেওয়া ও অসুস্থ পশু জবাই বন্ধ করাই একমাত্র কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
রংপুরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. রুহুল আমিন বলেন, “এটা শুধু পীরগাছা নয়, কাউনিয়া ও মিঠাপুকুরেও একই উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে। আটজনের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।” তিনি আরও জানান, অ্যান্টিবায়োটিক মজুত আছে এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবু ছাইদ বলেন, “জেলায় ১৩ লাখের বেশি গবাদিপশু আছে। ২৬ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৬৫ হাজার গবাদিপশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।”
রংপুর বিভাগের প্রাণিসম্পদ দপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক ডা. মো. আব্দুর হাই সরকার জানান, মাংস ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স নেওয়ার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে এবং প্রতিটি হাটে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার চেষ্টা চলছে। তবে জনবল সংকটের কারণে সব জায়গায় চিকিৎসক পাঠানো যাচ্ছে না।
চিকিৎসকরা বলছেন, বৈধ লাইসেন্স ও স্বাস্থ্য সনদ ছাড়া মাংস বিক্রি বন্ধ না হলে অ্যানথ্রাক্স নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। প্রতিটি হাটে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও টিকাদান কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি অসুস্থ পশু জবাই পুরোপুরি বন্ধ করতে না পারলে শীতের আগে রোগটি আবারও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।