গাজায় মানবিক সহায়তা নিয়ে যাওয়া ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র প্রায় সব নৌযান আটক করেছে ইসরায়েল। ছবিঃ রয়টার্স
মেলবোর্ন, ৩ অক্টোবর- গাজায় মানবিক সহায়তা নিয়ে যাওয়া ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র প্রায় সব নৌযান আটক করেছে ইসরায়েল। বৃহস্পতিবার (২ অক্টোবর) অন্তত ৪০টি নৌকা আটক করে দেশটির সেনারা। এ সময় সুইডিশ মানবাধিকার কর্মী ও পরিবেশ আন্দোলনের মুখ গ্রেটা থানবার্গসহ চার শতাধিক কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ হয়েছে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, আটক হওয়া নৌকাগুলো থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত ফুটেজে দেখা যায়, হেলমেট ও নাইটভিশন গগলস পরা সশস্ত্র ইসরায়েলি সেনারা একে একে জাহাজগুলোতে ওঠে। যাত্রীরা তখন লাইফ ভেস্ট পরে হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এক ভিডিওতে দেখা যায়, থানবার্গ ডেকে বসে আছেন, তাঁকে ঘিরে রেখেছে সেনারা। ২২ বছর বয়সি এই কর্মী আটকের আগে রেকর্ড করা একটি ভিডিওতে বলেন, “আপনি যদি এই ভিডিওটি দেখে থাকেন, তবে আমি ইসরায়েলি বাহিনী দ্বারা অপহৃত হয়েছি এবং আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমাদের মানবিক মিশন ছিল সম্পূর্ণ অহিংস এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা।”

অন্তত ৪০টি নৌকা আটক করে দেশটির সেনারা। ছবিঃ রয়টার্স
ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, আশদোদ উপকূলে আনা সব যাত্রী নিরাপদে ও সুস্থ আছেন। তবে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি জানান, ফ্লোটিলার সদস্যদের সোমবার বা মঙ্গলবারের মধ্যে ইসরায়েল থেকে ইউরোপে ফেরত পাঠানো হবে এবং এরই মধ্যে চার্টার ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা (জিএসএফ) কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রায় ৪৪৩ স্বেচ্ছাসেবককে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অনেকে বড় কার্গো জাহাজে স্থানান্তরের পর তীরে আনা হয়। এই নৌবহরে যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়ামসহ ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিনিধি, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা ছিলেন।
গাজায় ত্রাণ পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ ৩১ আগস্ট স্পেনের বার্সেলোনা থেকে যাত্রা শুরু করে। পরে ১৩–১৫ সেপ্টেম্বর তিউনিসিয়া ও ইতালির সিসিলি থেকে আরও কয়েকটি নৌযান এতে যুক্ত হয়। এর পর গ্রিসের সাইরাস দ্বীপ থেকেও ত্রাণবাহী নৌকা যোগ দেয় বহরে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা আগেই এই মিশনকে “নাটক” বলে অভিহিত করেছিলেন।

গাজা অভিমুখী নৌবহরে থাকা আলমা নৌযানের ডেকে বসে আছেন আরোহীরা। ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি। ছবি: রয়টার্স
ইসরায়েলের এ পদক্ষেপে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তুরস্ক। প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেপ এরদোয়ান বলেন, “এটি দেখায়, ইসরায়েলি সরকার শান্তির কোনো আশা জাগাতে চায় না।” আঙ্কারায় একে পার্টির নেতাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি বলেন, “গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার বিরুদ্ধে পরিচালিত সন্ত্রাসী আচরণের নিন্দা জানাই, যা গাজার ক্ষুধায় মারা যাওয়া শিশুদের প্রতি মানবিক সহানুভূতির প্রতীক ছিল।”
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসাও ইসরায়েলের সমালোচনা করে ফ্লোটিলায় থাকা দক্ষিণ আফ্রিকান নাগরিকদের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার নাতি এনকোসি জওলিভেলিলে ম্যান্ডেলা।

ফ্লোটিলা আটকের পর বিশ্বজুড়ে নিন্দা ও বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।ছবিঃ রয়টার্স
ইসরায়েলের মানবাধিকার সংস্থা আদালাহর পরিচালক সুহাদ বিশারা জানান, আটক কর্মীদের আশদোদ থেকে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে দক্ষিণ ইসরায়েলের কেতসিওত কারাগারে নেওয়া হবে, এরপর তাঁদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।
ফ্লোটিলা আটকের পর বিশ্বজুড়ে নিন্দা ও বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। ইতালি ও কলম্বিয়ায় বিক্ষোভ হয়েছে, পাশাপাশি গ্রিস, আয়ারল্যান্ড ও তুরস্কেও প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে। ইতালির শ্রমিক ইউনিয়নগুলো শুক্রবার সাধারণ ধর্মঘটের আহ্বান জানিয়েছে।
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা ছিল গাজার অবরোধ ভাঙার সাম্প্রতিকতম প্রচেষ্টা। প্রায় দুই বছরের যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে পরিণত এই অঞ্চলে খাদ্য, ওষুধ ও মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে এটি ছিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের এক যৌথ উদ্যোগ।
সুত্রঃ রয়টার্স