সর্বশেষ

ভারতের দুর্গাপূজা: যেখানে উপাসনা মিলে যায় সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে

  • 5:57 pm - October 07, 2025
  • পঠিত হয়েছে:৩৩ বার
২০২১ সালে জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেসকো দুর্গাপূজাকে ‘মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপাদান’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। ছবিঃ ইউএন নিউজ

মেলবোর্ন, ৭ অক্টোবর- ২০২১ সালে জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেসকো দুর্গাপূজাকে ‘মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপাদান’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি এক শহরব্যাপী শিল্প, কল্পনা ও সংস্কৃতির পুনর্নির্মাণ—যা গভীরভাবে যুক্ত বাংলা সংস্কৃতি, প্রবাসী বাঙালি ও বিশ্বের অসংখ্য মানুষের সঙ্গে।

শরতের কয়েকটি রাতে কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা রূপ নেয় এক বিশাল উন্মুক্ত প্রদর্শনীতে। স্থানীয় সম্প্রদায় তৈরি করে চমকপ্রদ অস্থায়ী মন্দির বা প্যান্ডেল, কুমারটুলির শিল্পীরা নদীর পলিমাটি দিয়ে গড়েন দেবী দুর্গার প্রতিমা, ঢাকিদের বাজনায় মুখরিত হয় রাস্তা, আর লাখো মানুষ ঘুরে বেড়ায় এক আলোকিত স্বপ্নলোক থেকে অন্যটিতে। চলতি মাসের বৃহস্পতিবার শেষ হয় এবারের উৎসব।

দেখতে এটি এক বিশাল আয়োজন হলেও, বাস্তবে এটি এক সামাজিক আন্দোলন। স্থানীয় ক্লাবগুলোর তহবিল সংগ্রহ, পরিবারের স্বেচ্ছাসেবামূলক অংশগ্রহণ, কারুশিল্পীদের সহযোগিতা, আর আলো, সংগীত, খাবার ও শিল্পকে ঘিরে গড়ে ওঠে এক নতুন অর্থনীতি। পরিবারগুলো আগেভাগেই ঠিক করে নেয় প্যান্ডেল ভ্রমণের রুট, শিল্পীরা ছন্দ ঠিক করে, খাবারের দোকান শহরজুড়ে সংযোগ গড়ে তোলে, আর পুরো শহরটাই হয়ে ওঠে এক প্রাণবন্ত মঞ্চ। শ্রেণি, জাত, ধর্মের বিভাজন এই মিলিয়ন মানুষের নগরে অন্তত কয়েকদিনের জন্য মিলিয়ে যায়।

ইউনেসকোর স্বীকৃতি

২০২১ সালে ইউনেসকো দুর্গাপূজাকে বর্ণনা করে “ধর্ম ও শিল্পের প্রকাশ্য পরিবেশনার সেরা উদাহরণ এবং সহযোগী শিল্পী ও ডিজাইনারদের উর্বর ক্ষেত্র” হিসেবে।
ভারতে ইউনেসকোর প্রতিনিধি টিম কার্টিস বলেন, “এটি ‘সর্বজনীনতা’র চেতনা ধারণ করে, যা ১৯২৬ সাল থেকে সম্প্রদায়ভিত্তিক উপাসনার ভিত্তি। কাদামাটির কারিগর থেকে ঢাকী, ডিজাইনার থেকে আয়োজক—পুরো শহর মিলে তৈরি করে বিশ্বের অন্যতম জীবন্ত সাংস্কৃতিক প্রকাশ।”

এই ঐতিহ্য কোনো স্মৃতিস্তম্ভে আবদ্ধ নয়; এটি জীবন্ত, হাতে হাতে স্থানান্তরিত, প্রতি বছর নতুন থিমে পুনর্নির্মিত হয়, এবং শ্রেণি, ধর্ম, ভাষা অতিক্রম করে মানুষকে একত্র করে।

একই সঙ্গে দুর্গাপূজা এখন বিশাল সৃজনশীল অর্থনীতির ক্ষেত্রও। ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই উৎসবের সঙ্গে যুক্ত শিল্পগুলো বছরে প্রায় ৪.৫৩ বিলিয়ন ডলার আয় সৃষ্টি করে, যা পশ্চিমবঙ্গের জিডিপির প্রায় ২.৫৮ শতাংশ।

বার্তাবহ শিল্প

জাতিসংঘের ভারতে আবাসিক সমন্বয়কারী শমবি শার্প এ বছর প্রথমবার দুর্গাপূজায় অংশ নেন। তিনি যান এক শতবর্ষী প্যান্ডেলে, যার থিম ছিল টেকসই কৃষি। সেখানে দেখানো হয়, দেবী দুর্গা এবার অসুরবধ করছেন কীটনাশক ও অনিরাপদ কৃষি পদ্ধতিকে। পেছনে প্রদর্শিত হয় পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের ২৮০টি ধান প্রজাতি। প্রায় দেড় কোটি মানুষ এই প্যান্ডেল দেখে জৈব কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও টেকসই উন্নয়নের বার্তা পেয়েছেন।

আরেকটি আলোচিত প্যান্ডেল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) থিমে তৈরি। সার্কিট বোর্ডের নকশা, আলোকিত তথ্যপ্রবাহ ও নীয়ন আলোয় ঘেরা পরিবেশে ঐতিহ্যবাহী দেবী দুর্গা দাঁড়িয়ে আছেন সিংহ ও দশ হাতে। বার্তাটি স্পষ্ট—বিশ্বাস ও প্রযুক্তি একসঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে।

৩০ বছর বয়সী ল্যাব টেকনিশিয়ান নূপুর হাজরা বলেন, “মানুষ যদি ইতিবাচকভাবে এআই গ্রহণ করে, তাহলে ভালো ফল হবে। নেতিবাচকভাবে নিলে তা ক্ষতি ডেকে আনবে।”
আইটি পেশাজীবী সুমিতম শোম বলেন, “দুর্গাপূজা আমাদের সবচেয়ে বড় উৎসব। এখন এআই নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। এটি ভালো কাজে লাগানো গেলে উপকার হবে, তবে প্রতারণা ও ডিপফেকের ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক থাকতে হবে।”

আরেকটি থিম “শব্দ” কেন্দ্র করে নির্মিত, যেখানে বিলুপ্তপ্রায় প্রকৃতির শব্দ—পাখির ডাক, পাতার মর্মর, ব্যাঙের ডাক—দৃশ্য ও শব্দের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এটি প্রকৃতি হারানোর বেদনা ও নস্টালজিয়ার প্রতিচ্ছবি। দর্শক রাজা বলেন, “এখন আর পাখি দেখা যায় না। আগে প্রচুর ছিল। হয়তো মোবাইল নেটওয়ার্কেরও প্রভাব আছে। এই প্যান্ডেল মানুষকে ভাবতে শেখায়, কীভাবে আবার পাখি ফিরিয়ে আনা যায়।”

বেশ কিছু প্যান্ডেল সামাজিক বার্তাও দিয়েছে—একটি এসিড হামলার বেঁচে থাকা নারীদের সম্মান জানিয়েছে, আরেকটি পানি সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
১৮ বছর বয়সী ছাত্রী তিসা বলেন, “প্রতিদিন ভূগর্ভস্থ পানি কমছে। এভাবে সচেতনতা ছড়ানোই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।”

সবার জন্য দুর্গাপূজা

দুর্গাপূজা এবার আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে।
২০২৫ সালের জুনে ইউনেসকো ও জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী সংগঠনগুলোর সহযোগিতায় উৎসব আয়োজকদের জন্য পূর্ণাঙ্গ প্রবেশযোগ্যতা নির্দেশিকা চালু করেছে।
এবার অনেক প্যান্ডেলে র‌্যাম্প, বাধামুক্ত পথ, ব্রেইল সাইনবোর্ড, সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ দোভাষী ও নিরিবিলি বসার জায়গা যুক্ত করা হয়েছে।

শমবি শার্প বলেন, “একজন বাবা জানিয়েছেন, ১৭ বছর পর তিনি প্রথমবারের মতো তাঁর হুইলচেয়ারে থাকা মেয়েকে নিয়ে দুর্গাপূজায় অংশ নিতে পেরেছেন। এটি ছিল এক আবেগঘন মুহূর্ত।”

দুর্গাপূজা আজ তাই শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি এক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক আন্দোলন—যেখানে উপাসনা, শিল্প, প্রযুক্তি, প্রকৃতি ও অন্তর্ভুক্তির মেলবন্ধন ঘটে একই আকাশের নিচে।

সুত্রঃ ইউএন নিউজ

এই শাখার আরও খবর

‘সমাজ সংস্কার’-এর নামে গ্রামে নোটিশ জারি গানবাজনা বন্ধের ঘোষণা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একটি গ্রামে ‘সমাজ সংস্কার’-এর কথা বলে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নোটিশ জারি করেছিল স্থানীয় একটি জামে…

আরব আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি ইরানের

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। শনিবার দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)…

মুন্সীগঞ্জে হিন্দু নারী কবিরাজ হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন, প্রতিবেশী মীর হোসেন গ্রেপ্তার

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে হিন্দু নারী ও স্থানীয়ভাবে পরিচিত কবিরাজ রেখা রাণী রায় হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘদিন…

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে এসে গ্রেপ্তার ৪, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে এসে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন চারজন। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে আদালতে…

এশিয়ান কাপ শেষে ইরানে ফেরা নিয়ে শঙ্কায় নারী ফুটবলাররা, অস্ট্রেলিয়ায় সুরক্ষার দাবি জোরালো

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ: ২০২৬ নারী এশিয়ান কাপ খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় থাকা ইরানের নারী ফুটবল দলকে ঘিরে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী, ইরানি-অস্ট্রেলীয় কমিউনিটি এবং খেলোয়াড়দের অধিকার…

তেহরান ও ইসফাহানে ইসরায়েলের নতুন দফায় ‘ব্যাপক’ বিমান হামলা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের রাজধানী তেহরান ও গুরুত্বপূর্ণ শহর ইসফাহানে নতুন দফা ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au