মেলবোর্ন, ২১ অক্টোবর- এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে জাপান প্রথমবারের মতো নারী প্রধানমন্ত্রী পেল। ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)–এর নেতা সানায়ে তাকাইচি (৬৪) মঙ্গলবার পার্লামেন্টের ভোটে জয়লাভ করে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জাপানের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে নারীর নেতৃত্বের নতুন অধ্যায় সূচিত হলো।
গত ৪ অক্টোবর এলডিপি এর নেতৃত্বে তাকাইচি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়া প্রায় নিশ্চিত ছিল। তবে সংসদে সরকার গঠনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। শেষ মুহূর্তে জাপান ইনোভেশন পার্টি (ইশিন নো কাই)–এর সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে একটি জোট গঠন করে এলডিপি ফলে সরকার গঠনের পথ সুগম হয়।
আজ (২১ অক্টোবর) নিম্নকক্ষে অনুষ্ঠিত ভোটে তাকাইচি ২৩৭ ভোট পেয়ে জয়ী হন, যেখানে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা কেঞ্জি এইদার হাতে আসে ২৩৩ ভোট। ফলে মাত্র চার ভোটের ব্যবধানে তাকাইচি জয়লাভ করেন।
সানায়ে তাকাইচি জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় নারা প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর রাজনীতিতে যোগ দেন ১৯৯০-এর দশকে।
তিনি দীর্ঘদিন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে–র ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এবং তাঁকে “আবের উত্তরসূরি” হিসেবেও দেখা হয়।
রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি বিভিন্ন সময় অর্থনীতি, যোগাযোগ ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন।
তাকাইচি তাঁর কঠোর রক্ষণশীল (conservative) অবস্থান, প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধির দাবি, এবং চীনের প্রতি কঠোর মনোভাবের জন্য পরিচিত।
তাকাইচির নীতিমালা সাধারণভাবে “ডানঘেঁষা” বলে বিবেচিত। তিনি জাপানের সংবিধানে পরিবর্তন এনে সেনাবাহিনীর কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে চান।
তবে তিনি একইসঙ্গে বলেছেন, তাঁর সরকার “অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও প্রযুক্তি–নির্ভর উন্নয়ন”–এ অগ্রাধিকার দেবে।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন —
“আমরা জাপানকে এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলব, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে গর্বের প্রতীক হবে। শক্তিশালী অর্থনীতি ও দৃঢ় প্রতিরক্ষা এই দুইই হবে আমাদের ভিত্তি।”
তাকাইচি নারী হলেও নারীর অধিকার ও সামাজিক সমতা বিষয়ক ইস্যুতে তিনি বরাবরই সংরক্ষণশীল অবস্থান নিয়েছেন।তিনি সমলিঙ্গ বিবাহের বিরোধিতা করেছেন এবং নারীদের নাম পরিবর্তন ছাড়াই বিবাহ করার অধিকারের বিষয়েও নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন।
এ কারণে, বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন ,তাকাইচির প্রধানমন্ত্রী হওয়া হয়তো প্রতীকী অগ্রগতি, তবে নারীর অধিকার ও সামাজিক সংস্কারে বাস্তব পরিবর্তন তেমন দেখা নাও যেতে পারে।
তাঁর নেতৃত্বে গঠিত জোট সরকার সংসদের দুই কক্ষেই পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে অর্থনীতি, করনীতি ও প্রতিরক্ষা সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করাতে তাকাইচিকে কঠিন রাজনৈতিক দরকষাকষির মুখোমুখি হতে হবে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, জাপানের বর্তমান দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি, শ্রমিক সংকট, ও জনসংখ্যা হ্রাসের সমস্যা মোকাবিলায় তাকাইচির সরকারের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাকাইচির নির্বাচনে অভিনন্দন জানিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন –
“জাপানে নারী নেতৃত্বের এই ঐতিহাসিক অর্জন বিশ্বে অনুপ্রেরণা জাগাবে।”
চীনের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানালেও তারা তাকাইচির কঠোর পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
জাপানের সমাজে লিঙ্গ–সমতার পথে এটি নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তবে সানায়ে তাকাইচির রক্ষণশীল অবস্থান তাঁর শাসনকালে নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার কতটা অগ্রসর হবে, তা নিয়ে এখনই শুরু হয়েছে বিশ্লেষণ ও বিতর্ক।
সূত্র : দ্য জাপান টাইমস।









