মেলবোর্ন, ২১ অক্টোবর- দীর্ঘ দুই বছর পর আবারও গাজার শিশুদের হাসি শোনা যাচ্ছে স্কুলের আঙিনায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই উপত্যকায় প্রায় ৩ লাখ শিক্ষার্থী সোমবার থেকে পুনরায় শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে-যা স্থানীয়দের কাছে “আশার সূচনা” হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ (UNRWA) জানায়, গাজার সীমিত নিরাপদ অঞ্চলে ও আংশিকভাবে মেরামত হওয়া ভবনগুলোতে শিক্ষাদান কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েল-হামাস সংঘাতের কারণে গাজায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়।
বেশিরভাগ স্কুল বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়।
অনেক স্কুলকে পরবর্তীতে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যেখানে যুদ্ধপীড়িত লাখো মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল।
গাজার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী-
- প্রায় ৬৬০,০০০ শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে ক্লাসে যেতে পারেনি।
- ৯০% স্কুল ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।
- অন্তত ১৮০০ শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মী নিহত বা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
শিক্ষাবিদদের মতে, এই দুই বছর শুধু পাঠ্যজীবন নয়, শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশেও গভীর প্রভাব ফেলেছে।
জাতিসংঘের সহায়তায় এবং স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে প্রায় ৩০০টি স্কুল আংশিকভাবে চালু করা হয়েছে।
ক্লাস পরিচালনা করা হচ্ছে দুই পালায় (morning & afternoon shifts), যাতে বেশি সংখ্যক শিশু পড়াশোনার সুযোগ পায়।ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুলের জায়গায় অস্থায়ী টিনশেড ও তাঁবুতে ক্লাস চলছে।প্রায় ৮,০০০ শিক্ষক এই পুনরায় চালু কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন।
ইউএনআরডব্লিউএ কমিশনার ফিলিপ লাজারিনি বলেন –
“এই শিশুদের ফিরে আসা কেবল শিক্ষার নয়, জীবনের প্রতীক। তারা ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেও ভবিষ্যতের আলো খুঁজছে।”
গাজা সিটির দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনিসে দশ বছর বয়সী ছাত্রি মারিয়াম হামদান বলল,
“আমি ভেবেছিলাম আর কখনও স্কুলে ফিরতে পারব না। আজ আমি আমার বই আর বন্ধুদের পেয়েছি – কিন্তু ভবনের পাশে এখনো গর্ত আর ধ্বংসস্তূপ।”
অন্যদিকে, অনেক শিক্ষার্থী এখনো ভয়ে স্কুলে ফিরছে।
ইউনিসেফ জানিয়েছে, প্রতিদিন স্কুলগামী শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মানবিক করিডোর তৈরি করা হয়েছে, যাতে সংঘাতের মাঝে তারা নিরাপদে যাতায়াত করতে পারে।
যদিও পাঠদান শুরু হয়েছে, কিন্তু গাজার শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে-
- শিক্ষার পরিবেশ এখনও অতি অনিশ্চিত ও অস্থির।
- অনেক এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত পানি, বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যসেবা নেই।
- ৪০% স্কুলে এখনও টয়লেট বা বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই।
- শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রয়োজন, কারণ যুদ্ধ তাদের মধ্যে গভীর ট্রমা সৃষ্টি করেছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বিবৃতিতে বলেন –
“গাজার প্রতিটি শিশু স্কুলে ফিরে যাওয়ার অধিকার রাখে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখনই শিক্ষা অবকাঠামো পুনর্গঠনে সহায়তা বাড়াতে হবে।”
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে এবং শিক্ষা পুনর্গঠনে অতিরিক্ত অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
অন্যদিকে, মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, “শিক্ষার অধিকারকে কখনো যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।”
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগটি যদিও সীমিত পরিসরে শুরু হয়েছে, তবুও এটি গাজার শিশুদের জন্য আশা ও স্থিতিস্থাপকতার প্রতীক।
দীর্ঘ দুই বছর যুদ্ধের ভেতরে কাটিয়ে, এই ৩ লাখ শিশু এখন বই, ক্লাসরুম ও সহপাঠীর শব্দে নিজেদের পৃথিবী আবার গড়ে তুলছে।
এক শিক্ষক বলেন –
“আমরা হয়তো দেয়াল ও ছাদ হারিয়েছি, কিন্তু শেখানোর বিশ্বাস এখনো অটুট।”