‘সমাজ সংস্কার’-এর নামে গ্রামে নোটিশ জারি গানবাজনা বন্ধের ঘোষণা
মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একটি গ্রামে ‘সমাজ সংস্কার’-এর কথা বলে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নোটিশ জারি করেছিল স্থানীয় একটি জামে…
মেলবোর্ন, ১ নভেম্বর- আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা হারানোর পর খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সন্ত্রাসী বাহিনীর উত্থান ঘটেছে। রাজশাহী, কুষ্টিয়া, নোয়াখালীতে যেমন কাকন, চাঁন, ফারুক ও তোতলা বাহিনী আধিপত্য বিস্তার করছে, তেমনি খুলনায় আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে ‘হুমা বাহিনী’। শহর থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে মহেশ্বরপাশা এলাকায় আধিপত্য আর মাদক সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে একের পর এক রক্ত ঝরছে। গত সাড়ে তিন মাসে ওই এলাকায় তিনটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর প্রায় সবকটিতেই এসেছে সন্ত্রাসী হুমায়ুন কবির হুমার নাম।
মতলেব শেখের ছেলে হুমায়ুন কবির হুমা (৩৭) দৌলতপুর থানার মহেশ্বরপাশা বণিকপাড়ার বাসিন্দা। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির একাধিক মামলা রয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে বাগেরহাটের রামপালে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হন তিনি। চলতি বছরের ২৪ জুলাই জামিনে বেরিয়ে আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। স্থানীয়দের ভাষায়, জেলে থাকা অন্য সন্ত্রাসীরা অনুপস্থিত থাকায় হুমা পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে মাঠে নেমেছেন।
এলাকার মানুষ জানাচ্ছেন, হুমার বাহিনী প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিচ্ছে। সর্বশেষ ২৮ অক্টোবর দুটি বাড়িতে ১৫ রাউন্ড গুলি ছোড়ে তারা। এ ঘটনায় জড়িত ওসমান ও সেলিম নামে দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে মূল হুমা এখনও অধরা। আতঙ্কে এখন কেউই মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। এক বাসিন্দা বলেন, “আমাদের কারও সঙ্গে ওদের কোনো ঝামেলা নেই, তবুও ৯ রাউন্ড গুলি করেছে। ওরা বলছে, ওদের ছাড়া এলাকায় কেউ থাকতে পারবে না।”
একের পর এক হত্যাকাণ্ড
গত ১১ জুলাই মহেশ্বরপাশা পশ্চিমপাড়ায় সাবেক যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান মোল্লাকে গুলি করে ও পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয়। পুলিশ পরে হুমার সহযোগী কাজী রায়হান, আসিফ মোল্লাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে। তদন্তে জানা যায়, মাদক ব্যবসা ও একটি বাড়ি দখল নিয়ে মাহবুবের সঙ্গে হুমার দ্বন্দ্ব ছিল। এর আগেও ২০১৪ সালে কুয়েটের পকেট গেটের সামনে যুবলীগ নেতা আরিফ হোসেনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় হুমা ও তার সহযোগীরা জড়িত ছিলেন।
এরপর ৩ আগস্ট মহেশ্বরপাশা উত্তর বণিকপাড়ায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় ঘের ব্যবসায়ী আলামিন হাওলাদারকে। ১ অক্টোবর নিজ ঘরে খুন হন তানভীর হাসান শুভ। এসব ঘটনায় থানায় পৃথক মামলা হলেও অধিকাংশ আসামি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। খুলনা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার তাজুর ইসলাম বলেন, “তিনটি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে যোগসূত্র আছে। তদন্ত চলছে।”
দ্বন্দ্বে বিভক্ত সন্ত্রাসী চক্র
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, নব্বইয়ের দশকে মহেশ্বরপাশা এলাকায় পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির উত্থান ঘটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তা অনেকটা দমন হয়, কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর পুরনো সন্ত্রাসীরা আবার এলাকায় ফিরতে শুরু করে। কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে তারা ফের চাঁদাবাজি, দখল ও মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে।
প্রবীণরা জানান, সাবেক কমিউনিস্ট নেতা শেখ শাহীনুল হক ওরফে বড় শাহীনের আশ্রয়ে হোসেন ঢালী, আরমান হোসেন ও হুমা নতুন করে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তবে কিছুদিন পর নিজেদের মধ্যেই দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ১৫ মার্চ অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বড় শাহীন খুন হন, এরপর হুমা আলাদা বাহিনী গড়ে তোলে।
পুলিশের দুর্বলতা ও জনঅসহায়তা
চার মাসে তিনটি খুনের পরও মূল আসামিদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় স্থানীয় রাজনীতিক ও সামাজিক নেতারা পুলিশের ব্যর্থতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। বিএনপির দৌলতপুর থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক ইমাম হোসেন বলেন, “পুলিশের ঢিলেঢালা তৎপরতার কারণেই সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।” জামায়াতে ইসলামের নেতা মোশাররফ আনসারী বলেন, “একই এলাকায় একের পর এক খুন হচ্ছে, অথচ কেউ ধরা পড়ছে না—এটা ব্যর্থতা ছাড়া কিছু নয়।”
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, “সন্ত্রাসীরা দ্রুত জামিন পাচ্ছে, রিমান্ডও মঞ্জুর হচ্ছে না। এটা খুবই উদ্বেগের।”
খুলনা মহানগর পুলিশের কমিশনার জুলফিকার আলী হায়দার বলেন, “খুনগুলোতে প্রশিক্ষিত ও পেশাদার সন্ত্রাসী জড়িত। তারা দ্রুত এলাকা ছাড়ে বলে ধরতে সময় লাগছে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, বাকিদের ধরতে অভিযান চলছে।” তিনি আরও বলেন, “জনসাধারণের সহযোগিতা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন।”
মহেশ্বরপাশার মানুষ এখন ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ কথা বলতে চান না, কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। রাত নামলেই এলাকায় ভর করে গুলি, আতঙ্ক আর ‘হুমা বাহিনী’র নাম।
সুত্রঃ দৈনিক সমকাল
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au