বাংলাদেশ

নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পরও বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা অধরা

  • 9:35 pm - November 06, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১৯৩ বার
বাংলাদেশে দায়মুক্তি পাচ্ছেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকারীরা। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৬ নভেম্বর- এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর, কিন্তু বাংলাদেশ এখনো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক গতি ও আঞ্চলিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে সংগ্রাম করছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে, তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মেরুকরণ ও নিরাপত্তাজনিত অস্থিরতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দমননীতির অভিযোগ

২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পতনের পর ড. ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল সেনাবাহিনী ও ছাত্রনেতারা। তবে এক বছরের মাথায় সরকার এখন সেনাবাহিনী, বিরোধী দল ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে। সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও সহিংসতা এখনো নিয়মিত। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল, এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার করে সাবেক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দমন করছে।

সরকার “অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা” জারি করেছে আওয়ামী লীগ–সমর্থিত সভা, প্রকাশনা ও অনলাইন কার্যক্রমে, এবং দলটির নিবন্ধনও বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে ইউনুস প্রশাসনের ওপর জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টিকে (এনসিপি) সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা রাজনৈতিক বিভাজন আরও বাড়িয়েছে।

অর্থনীতির টানাপোড়েন

অর্থনৈতিক দিক থেকেও চ্যালেঞ্জে আছে বাংলাদেশ। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিনিয়োগ কমে যাওয়া ও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে চাপ তৈরি করেছে। কৃষিখাত দুর্বল, আগস্ট মাসে দশ মাসের মধ্যে প্রথমবার উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। পোশাকশিল্পে ৯০টির বেশি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, চাকরি হারিয়েছে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক। বিদেশি বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে।

মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব বাড়ায় সামাজিক বৈষম্যও বেড়েছে। ব্যাংক খাত দুর্নীতি ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনায় জর্জরিত, অকার্যকর ঋণ ও নগদ সংকটও তীব্র। দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির কারণে তৈরি পোশাক খাত আরও চাপে পড়েছে।

প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন

চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হলেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে সরকারের ইসলামপন্থী অংশীদারদের ভারতবিরোধী বক্তব্য এবং শেখ হাসিনাকে ভারতের আশ্রয় দেওয়ার ইস্যু। ঢাকা এখনো দিল্লির কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ দাবি করে আসছে। ফলে দুই দেশের নেতাদের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ মন্তব্যের বিনিময় চলছে।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশি অভিবাসন নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যা আবারও সামনে এসেছে। সীমান্তে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। অন্যদিকে, মিয়ানমার থেকে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর উপস্থিতি দেশের ভেতরে নতুন সামাজিক চাপ তৈরি করেছে।

চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বেইজিংয়ের বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এই প্রচেষ্টায় বাধা তৈরি করছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে সরাসরি ফ্লাইট ও বাণিজ্য সম্পর্ক পুনরায় শুরু হয়েছে, কিন্তু ভারত হয়ে যোগাযোগ না থাকায় বাণিজ্যের সুযোগ সীমিত।

নির্বাচনী অনিশ্চয়তা

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। শিক্ষার্থী আন্দোলনের নেতৃত্বে গঠিত এনসিপি তৃতীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন। তবে গোপন সমর্থন এখনো আওয়ামী লীগের দিকেই বেশি বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

সেনাবাহিনী নির্বাচনের পক্ষে, তবে ইসলামপন্থী জোট জিতলে তারা হস্তক্ষেপ করতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। বিএনপি “জাতীয় ঐক্য সরকার” গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছে, যেখানে জামায়াত ও এনসিপি অংশ নিতে পারে।

সম্ভাব্য চিত্র

সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি হলো: সহিংসতা ও বিক্ষোভের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, বিএনপি জয়ী হলেও কম ভোটে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকবে। অন্য সম্ভাবনা হলো, সেনাবাহিনীর সহায়তায় আওয়ামী লীগ বাদে একটি ঐক্য সরকার গঠিত হবে, কিন্তু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তখনও আসবে না।

বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে। রাজনৈতিক পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষা, অর্থনৈতিক চাপে নতি স্বীকার এবং আঞ্চলিক কূটনীতির অস্থিরতার মধ্যে দোদুল্যমান।


লেখক- হুসেইন হাক্কানি হাডসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো এবং ২০০৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে জটিল সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্ক পরিচালনার জন্য তিনি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। তিনি বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ছিলেন এবং কূটনীতি, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইসলামি রাজনীতি ও যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ।

মূল প্রতিবেদনঃ  Geopolitical Intelligence Services ; অনুবাদ ও সম্পাদনা: ওটিএন বাংলা

এই শাখার আরও খবর

শাহজালাল বিমানবন্দরে আগুন, আতঙ্কে বিদেশগামী যাত্রীরা

ওটিএন বাংলা ডেস্ক : রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি স্টোর বিল্ডিংয়ে আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়ায় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর)…

সরকার চায় ঐক্য, একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি: প্রধানমন্ত্রী

দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্য গড়ে তুলতে চায় সরকার। তবে সরকার যখন সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন একটি মহল দেশে বিভ্রান্তি ছড়ানোর…

ইশরাকের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে প্রজ্ঞাপন জারি

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি। এ বিষয়ে মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে…

মসজিদে বয়ানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য খতিবের, নিরব প্রশাসন

ঢাকার খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ এলাকার টানপাড়ার জামতলা জামে মসজিদে জুমার বয়ানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রসাদ নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে মসজিদটির অস্থায়ী খতিব…

কিম জং উনের স্বাস্থ্য নিয়ে গুঞ্জন, কী জানা যাচ্ছে?

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের শারীরিক অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জল্পনা ছড়িয়েছে। সম্প্রতি তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে কোমায় আছেন বলে কিছু…

ফ্রান্সজুড়ে চলছে দাঙ্গা-লুটপাট, প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে কারফিউ জারি

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ থেকে ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় রাজধানী প্যারিসের কয়েকটি এলাকা এবং দেশটির বিভিন্ন শহরে রাতের কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au