৯ নভেম্বর রাতে ঘূর্ণিঝড়টি স্থানীয়ভাবে ‘উওয়ান’ নামে পরিচিত ফাং–ওং, প্রবল বেগে উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় অরোরা প্রদেশে আঘাত হানে। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১০ নভেম্বর- পিঠেপিঠি দুটি ভয়াবহ ঝড়ের আঘাতে বিপর্যস্ত ফিলিপাইন আবারও তছনছ হয়ে গেল সুপার টাইফুন ফাং–ওং এর তাণ্ডবে। দেশজুড়ে এক মিলিয়নের বেশি মানুষকে সরিয়ে নিতে হয়েছে, পরীক্ষা হচ্ছে সরকারের দুর্যোগ মোকাবিলা সক্ষমতার।
রবিবার, ৯ নভেম্বর রাতে ঘূর্ণিঝড়টি স্থানীয়ভাবে ‘উওয়ান’ নামে পরিচিত ফাং–ওং, প্রবল বেগে উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় অরোরা প্রদেশে আঘাত হানে। ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটার বেগে বাতাস বয়ে যায়, দমকা হাওয়া পৌঁছে যায় ২৩০ কিলোমিটারে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানায়, প্রায় ১,৮০০ কিলোমিটার জুড়ে থাকা ঝড়ের বিশাল বৃষ্টিপাত ও বাতাসের বলয় দেশের দুই–তৃতীয়াংশ অঞ্চলকে গ্রাসের হুমকি দেয়। এর আগে টাইফুন কালমেগি ফিলিপাইনের মধ্যাঞ্চল তছনছ করে গেছে, তাতে অন্তত ২২৪ জনের মৃত্যু হয়।
ফাং–ওং–এর আগমনের আগে ১০ লাখেরও বেশি মানুষকে উপকূলীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। তারা আশ্রয় নেয় গির্জা, ক্রীড়া কেন্দ্র ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে। অনেকেই আগের ভয়াবহ টাইফুন হাইয়ানের কথা স্মরণ করে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। “আমরা নিরাপদে থাকতে চেয়েছি, আগের ঝড়ে পানি উঠেছিল,” বলেন নর্লিতো দুগান, সোরসোগনের এক গির্জায় আশ্রয় নেওয়া এক বাসিন্দা।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী গিলবার্তো তেওদোরো জনগণকে আগাম সরিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “শেষ মুহূর্তে উদ্ধার অভিযানে নামতে হলে আমাদের পুলিশ, সেনা ও নৌকর্মীদের জীবন ঝুঁকিতে পড়বে।” তবে কিছু বাসিন্দা ঘরবাড়ি রক্ষায় পিছু হটেননি।
আবহাওয়া দপ্তর পাগাসা অরোরা, নুয়েভা ভিসকায়া ও কামারিনেস নর্তের জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করে জানায়, রবিবার ও সোমবার দ্বীপজুড়ে ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হতে পারে এবং তিন মিটারেরও বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা রয়েছে। পূর্বাঞ্চলীয় কাটান্দুয়ানেস দ্বীপে সকালেই প্রচণ্ড বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসে দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্যে নেমে আসে।
ঝড়টি উপকূলে আছড়ে পড়ার আগেই প্রাণহানি ঘটে। কাটান্দুয়ানেসে একজন গ্রামবাসী বন্যার পানিতে ডুবে মারা যান, পূর্ব সামারের ক্যাটবালোগান শহরে ৬৪ বছর বয়সী এক নারী নিরাপদ স্থানে যেতে গিয়ে প্রাণ হারান।
ঝড়ের প্রভাবে প্রায় ৩০০টি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, ৬,৬০০–এর বেশি যাত্রী ও নৌ–কর্মী বিভিন্ন বন্দর এলাকায় আটকা পড়েছেন। লুজন দ্বীপে স্কুল ও সরকারি অফিসগুলো সোমবার ও মঙ্গলবার বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। রাজধানী ম্যানিলায় ২০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি ও পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে।
কালমেগি পরবর্তী উদ্ধার অভিযানও স্থগিত রাখতে হয়েছে ঝড়ের তীব্রতার কারণে। সরকার জরুরি অবস্থা জারি রেখে ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড়ের ভয়াবহতার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দেখা গেছে সেতুতে প্রচণ্ড বাতাসের আঘাত, রাস্তায় বন্যার পানি ও উপকূলে ঢেউয়ের তাণ্ডব।
আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, ফাং–ওং উত্তর লুজন পেরিয়ে সোমবার সকালে লিঙ্গায়েন উপসাগরের দিকে চলে যাবে, তবে তখনও এটি শক্তিশালী টাইফুন হিসেবেই থাকবে। সব ধরনের জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
ফিলিপাইন প্রশান্ত মহাসাগরের টাইফুন বেল্টে অবস্থিত, যেখানে প্রতিবছর গড়ে ২০টি ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়, এর অর্ধেক দেশটিকে সরাসরি আঘাত করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা না বাড়লেও তাদের শক্তি ও ধ্বংসক্ষমতা বাড়ছে বলে বিজ্ঞানীদের মত।
লুজন ও আশপাশের এলাকায় বৃষ্টি ও ঝড় অব্যাহত থাকায় দেশটির প্রধান উদ্বেগ এখন মানুষকে নিরাপদ রাখা এবং পরবর্তী পুনর্গঠনের প্রস্তুতি নেওয়া।
সুত্রঃ রয়টার্স