বিশ্ব

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ২৩৫, আহত দেড় হাজারের বেশি

ধ্বংসস্তূপে আটকা অনেকে

  • 12:51 pm - June 26, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৪৭ বার
ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলায় ফের কম্পন । ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২৬ জুন-দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত এক হাজার ৫২০ জন। দেশটির জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, এখনো প্রায় ২০০ মানুষ বিভিন্ন ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন। ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বুধবার স্থানীয় সময় বিকেলে আঘাত হানা এই জোড়া ভূমিকম্পের পর দেশজুড়ে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চলছে। দুর্গত এলাকায় সেনাবাহিনী, দমকল, উদ্ধারকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবীরা ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছেন। একই সঙ্গে জরুরি চিকিৎসা ও ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দিতে স্থানীয় প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও তৎপর রয়েছে।

ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাজধানী কারাকাসের কাছে অবস্থিত সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা পরীক্ষা না হওয়া পর্যন্ত বিমানবন্দর চালু করা হবে না বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভেনেজুয়েলার প্রতি দ্রুত মানবিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দ্রুত, কার্যকর ও বৃহৎ পরিসরে মানবিক সহায়তা পাঠানো হবে। বিভিন্ন দেশও উদ্ধারকারী দল ও ত্রাণ সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) সতর্ক করে জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি এবং বড় ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, দুর্যোগের প্রভাব ভেনেজুয়েলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে এবং শেষ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা কয়েক হাজারেও পৌঁছাতে পারে।

স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে ইয়ারাকুই অঙ্গরাজ্যের রাজধানী সান ফেলিপের কাছে প্রথম ৭ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর মাত্র ৪০ সেকেন্ড পর একই অঙ্গরাজ্যের ইউমারে শহরের প্রায় ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দ্বিতীয় ও আরও শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। ইউএসজিএস জানিয়েছে, ১৯০০ সালের পর এটিই ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। এরপর রাতজুড়ে একাধিক পরাঘাতও অনুভূত হয়েছে।

বুধবার সন্ধ্যায় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানলে রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বহু ভবন ধসে পড়ে। ছবিঃ সংগৃহীত

ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানী কারাকাস, লা গুইরা এবং আশপাশের অঞ্চল। বহু বহুতল ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। বিভিন্ন হাসপাতাল, উদ্ধারকেন্দ্র এবং দুর্ঘটনাস্থলে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে মানুষের ভিড় দেখা গেছে। আহতদের অনেককে স্ট্রেচারে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদ্ধার অভিযান প্রত্যাশার তুলনায় ধীরগতিতে চলছে। বহু মানুষ এখনো ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকা রয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু এলাকায় উদ্ধারকারী দল এখনো পৌঁছাতে পারেনি।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুইরা এলাকার বাসিন্দা ৪৯ বছর বয়সী ল্যারি রোজাস জানান, তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য একটি ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকা পড়েছেন। ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে আমাদের কাছে কিছুই নেই। ভেতরে যাওয়ার মতো শক্তি বা সাহসও নেই।”

জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরে জানান, নিহতের সংখ্যা ১৬৪ থেকে বেড়ে ১৮৮ জনে পৌঁছেছে। আহতের সংখ্যা বেড়ে এক হাজার ৫২০ জন হয়েছে। অন্তত ২০০ জন এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা রয়েছেন। এ ছাড়া প্রায় ২৫০টি ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস হয়েছে।

ইউএসজিএসের পূর্বাভাসভিত্তিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই দুর্যোগে শেষ পর্যন্ত প্রাণহানির সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

এদিকে নিখোঁজদের সন্ধানে ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতাদের উদ্যোগে একটি বিশেষ ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে। সেখানে স্থানীয় সময় দুপুর পর্যন্ত ৩৯ হাজারের বেশি মানুষকে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। যদিও এ তালিকায় একই ব্যক্তির নাম একাধিকবার যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বুধবার সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষ বাড়িতে কিংবা বিভিন্ন জনসমাগমে অবস্থান করছিলেন। এ কারণে হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্থানীয় সাংবাদিক পল ডবসন আল জাজিরাকে বলেন, ভেনেজুয়েলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ও নৌপথনির্ভর জনপদে এখনো উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেনি। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগের অভাব এবং দুর্বল উদ্ধার সক্ষমতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি অব্যাহত পরাঘাত উদ্ধার কার্যক্রমকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

ভূমিকম্পের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে কারাকাসের বাসিন্দা মারিয়া আলেহান্দ্রা বলেন, নিচে নেমে যা দেখেছেন, তা যেন কোনো ভয়াবহ চলচ্চিত্রের দৃশ্য। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে ছিল এবং সেগুলো টপকে নিরাপদ স্থানে যেতে হয়েছে।

ভূমিকম্পের পর রাজধানী কারাকাসের বিভিন্ন এলাকায় বহুতল ভবন ধসে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। ছবিঃ সংগৃহীত

কারাকাসের বাসিন্দা কোরো মার্তিনেজ বলেন, হঠাৎ বিকট শব্দের পর ঘরের সব জিনিসপত্র পড়ে যেতে শুরু করে। জীবনে এমন ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি তিনি আগে কখনো হননি।

অন্য এক বাসিন্দা অ্যাস্ট্রিড রামিরেজ বলেন, কম্পন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে মানুষের চিৎকার শোনা যায়। সবাই প্রাণ বাঁচাতে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসেন।

রাজধানীর দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দা ৮০ বছর বয়সী মারিয়া রোমেরো বলেন, পুলিশ তাঁদের নিরাপদে বের হতে সহায়তা করেছে। তাঁর মতে, এটি ১৯৬৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের চেয়েও ভয়ংকর।

ভূমিকম্পে রাজধানীর কাছে অবস্থিত মাইকেতিয়া বিমানবন্দরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বিমানবন্দরের একটি ভবনের ছাদ ও দেয়ালের অংশ ভেঙে পড়তে দেখা গেছে। ধুলার ঘন মেঘে পুরো এলাকা ঢেকে যায়।

বুধবার সন্ধ্যায় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানলে রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বহু ভবন ধসে পড়ে। ছবিঃ সংগৃহীত

সরকার জানিয়েছে, আহতদের চাপ সামাল দিতে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হয়েছে। সপ্তাহের বাকি সময়ের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের পুঁজিবাজারও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বিভিন্ন দেশ থেকে সহায়তার প্রস্তাবের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তায় বলেন, ভেনেজুয়েলার জনগণের ওপর আঘাত হানা এই দুটি ভয়াবহ ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত।

ভূতাত্ত্বিকভাবে ভেনেজুয়েলা ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় দেশটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এর আগে ১৯৬৭ সালে ৬ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্পে রাজধানী কারাকাসে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। আর ১৮১২ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে ইউএসজিএসের তথ্য বলছে।

সূত্রঃ আল জাজিরা

এই শাখার আরও খবর

ঢাবিতে চালু হলো শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য একটি অনলাইন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। duevaluation.com নামের এই প্ল্যাটফর্মে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন। মূল্যায়নকারী শিক্ষার্থীর…

ডেঙ্গুতে এক সপ্তাহে প্রাণ হারালেন ২৪ জন

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১…

নতুন বাসায় ওঠার পরদিনই হিন্দু চিকিৎসকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

সিলেট নগরীর মির্জাজাঙ্গাল এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে পদ্মজিৎ চক্রবর্তী প্রান্ত (৩১) নামে এক শিক্ষানবিশ চিকিৎসকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নতুন বাসায় ওঠার পরদিনই…

‘ঘৃণা নয়, শুদ্ধ সাত্ত্বিক প্রেমই আরএসএসের ভিত্তি’: লন্ডনে মোহন ভাগবত

লন্ডনে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) কাজের মূল দর্শন তুলে ধরে সংগঠনটির সরসংঘচালক মোহন ভাগবত বলেছেন, তীব্র ঘৃণা নয়, ‘শুদ্ধ সাত্ত্বিক প্রেম’ই আরএসএসের কর্মকাণ্ডের ভিত্তি। পারস্পরিক…

নিখোঁজের ৮ ঘণ্টা পর গর্ত থেকে শিশু বিথি রায়ের মরদেহ উদ্ধার

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় নিখোঁজ হওয়ার প্রায় আট ঘণ্টা পর বিথি রায় নামে ছয় বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সোমবার রাত ৮টার দিকে…

যুক্তরাজ্যে ফিরলেও রাজপরিবারের দায়িত্বে ফিরছেন না হ্যারি-মেগান

যুক্তরাজ্যে প্রিন্স হ্যারি ও তাঁর স্ত্রী মেগান মার্কেলের ফেরার খবরে রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যেই হ্যারি ও মেগানের…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au