আশা, সংশয় আর অন্তর্বর্তী শূন্যতা: নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায় বাংলাদেশ। প্রতীকী ছবি
মেলবোর্ন ১৭ নভেম্বর ২০২৫: বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা আজ এমন এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে বিচারকেরা নিজেরাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী সারা হোসেন বহু আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে বিচারকরা ভয় ও চাপে এতটাই নিমজ্জিত যে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। তাঁর সেই সতর্কবার্তা আজ আরও গাঢ় বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে-যখন ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। জনতার সন্ত্রাস, আদালত অবরোধ, বিচারকদের পদত্যাগে বাধ্য করা, নির্বিচারে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া, আদালত প্রাঙ্গণে হামলার মতো ঘটনাগুলো বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দিয়েছে।
প্রতিশোধই যেন নতুন রাষ্ট্রনীতি
ন্যায়বিচারের নামে প্রতিশোধমূলক বিচার চালানোর যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই আইনের শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অপসারিত নেতা শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছে-যেখানে তাঁকে ‘গণহত্যাকারী’ রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে-তা রায় ঘোষণার আগে বিচারপ্রক্রিয়াকে নিরপেক্ষতার ঊর্ধ্বে রাখার পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড রক্ষার অনুরোধ, বিশেষ করে ব্রিটিশ হাউস অফ লর্ডসের সদস্য লর্ড কার্লাইলের স্বচ্ছতা ও সংস্কারের আহ্বান, উপেক্ষিতই থেকে গেছে। বরং সরকারের প্রচারযন্ত্র পুরোপুরি সক্রিয় হয়ে জনগণের চোখে প্রতিপক্ষকে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কাজে লিপ্ত হয়েছে।
জনতার সন্ত্রাস ও বিচারকদের পদত্যাগ
ড. ইউনুস ক্ষমতায় বসার পর পরই দেশের সর্বোচ্চ আদালত জনতার অবরোধে জর্জরিত হয় এবং প্রধান বিচারপতিসহ কয়েকজন বিচারককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়-যা সরাসরি সংবিধানবিরোধী। এমন হঠকারী অপসারণে তদন্ত বা সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার কোনো অনুসরণই ছিল না। স্বাধীন আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, এ ধরনের অনিয়ম শুধু বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতাই ক্ষুণ্ণ করে না, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভিত্তিও নষ্ট করে।
জামায়াত ঘনিষ্ঠদের বিচারব্যবস্থার কেন্দ্রে বসানো
বিচারকদের ওপর দমনপীড়নের পাশাপাশি আইনি কাঠামোর শীর্ষে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে এমন একদল ব্যক্তিকে, যাদের অতীত রাজনৈতিক পরিচয়, বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড জামায়াতপন্থী এবং যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষের ছিল। যুদ্ধাপরাধ মামলায় কুখ্যাত আসামিদের পক্ষে লড়াই করা আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে প্রধান প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জামায়াতের পক্ষে লবিং করা টবি ক্যাডম্যানকে উপদেষ্টা পদ দেওয়া-সব মিলিয়ে বিচারব্যবস্থাকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারায় সম্পূর্ণ ঝুঁকিয়ে ফেলেছে। ফলে নিছক বিচার নয়, বরং প্রতিপক্ষের ওপর প্রতিশোধ নেয়ার একটি সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি হয়েছে।
ইনডেমনিটি দিয়ে অপরাধীদের রক্ষা এবং মিথ্যা মামলার বিস্তার
জুলাই–আগস্টের সহিংসতার নামে যেসব ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা ভেঙে ফেলেছিল-যাদের বিরুদ্ধে পুলিশের হত্যাকাণ্ড, থানায় লুট, জেল ভাঙা, অগ্নিসংযোগের মতো ভয়াবহ অভিযোগ ছিল-তাদের বিরুদ্ধে মামলা না করার ঘোষণা দিয়ে সরকার এক ধরনের বাছাই করা ন্যায়বিচারের জন্ম দেয়। একই সময়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রায় ৬০০ এবং সারা দেশে হাজারের বেশি মামলা দায়ের হয়, যা বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রতিহিংসার অস্ত্রে পরিণত করার স্পষ্ট নিদর্শন। অধিকারকর্মীরা এই মামলা-ঝড়কে ‘আইনের অপব্যবহারের সবচেয়ে নগ্ন উদাহরণ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
আদালত প্রাঙ্গণে হামলা ও আইনজীবীদের ওপর নির্যাতন
আদালত প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর প্রকাশ্যে হামলা নতুন ভয়াবহতার জন্ম দিয়েছে। পুলিশ উপস্থিত থাকলেও হামলাকারীরা নিরাপদেই ঘুরে বেড়িয়েছে, যা স্পষ্টতই বিচারব্যবস্থাকে ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল। শুধু অভিযুক্ত নয়, তাদের আইনজীবীরাও নানা হামলা, গ্রেফতার ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। হিন্দু ধর্মীয় গুরু চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আইনজীবীদের আদালতে প্রবেশ করতে না দেওয়া, ৭২ জন আইনজীবীকে মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতার করা-এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে আইনি সহায়তার সাংবিধানিক অধিকারই এখানে লঙ্ঘিত হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ, জামায়াত বৈধ–বিচারের দ্বৈতমানদণ্ড
রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বন্ধ করে সরকার আসলে বিচারব্যবস্থাকে আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট পথে পরিচালিত করার বার্তা দিয়েছে। এর বিপরীতে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জামায়াতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি আইসিটি আইনে নতুন সংশোধনী এনে চার্জ গঠিত হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা পদধারার অধিকার বাতিল করা হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি বিচারব্যবস্থার ‘রাজনৈতিক ব্যবহার’-এর সবচেয়ে কৌশলী ধাপ।
যুদ্ধাপরাধীর খালাস ও বিচারব্যবস্থার পক্ষপাতিত্ব
যুদ্ধাপরাধী এ টি এম আজহারুল ইসলামের খালাস বিচারব্যবস্থার গভীর সংকটকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। আগে যিনি এই মামলায় ডিফেন্সে ছিলেন, সেই তাজুল ইসলামই এবার রাষ্ট্রপক্ষ হয়ে তাঁর খালাসের আবেদন জানানো-এখনকার বিচারব্যবস্থার গভীর অনৈতিকতা ও রাজনৈতিক জোটের প্রকৃতি তুলে ধরে। আইনশাস্ত্রের মূলনীতিই হলো-একজন আইনজীবী একই মামলায় দুই পক্ষের হয়ে কাজ করতে পারেন না। এই নিয়ম ভেঙে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতার শেষ অবশিষ্টটুকুও ম্লান হয়ে গেছে।
বিকৃত অডিও ক্লিপ দিয়ে মিডিয়া ট্রায়াল
বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক মাধ্যমগুলোতে রাষ্ট্র সরবরাহিত অডিও ক্লিপ প্রচার করে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার চেষ্টা করা হয়, যেখানে ভিডিও প্রমাণ নেই এবং অডিওর সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রধান প্রসিকিউটর নিজেই স্বীকার করেছেন যে এই অডিও তিনি দিয়েছেন-যা বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতা-উভয়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বিচারকদের পদত্যাগ ও ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতা
বিচারকদের ওপর হামলা, হুমকি এবং রাজনৈতিক প্রভাবে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। অনিরাপত্তার এই পরিবেশে বিচারকরা স্বাধীন সিদ্ধান্ত কীভাবে নেবেন-সেই প্রশ্ন আজ পুরো বিচারব্যবস্থাকে গ্রাস করেছে। প্রায় ৩১ জন বিচারককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে এবং নতুন নিয়োগগুলোও রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে-যা বিচারব্যবস্থার ভিত্তিমূলকে দুর্বল করে দিয়েছে।
নিজ মামলার দ্রুত খালাস ও দ্বিমুখী মানদণ্ড
ড. ইউনুস ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি ও খালাস বিচারব্যবস্থার রাজনৈতিক ব্যবহারের সবচেয়ে সুস্পষ্ট উদাহরণ। মানবাধিকারকর্মী জেড আই খান পন্নার কথায়, “যেভাবে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর মামলার রায় বদলেছে, ক্ষমতা আবার বদল হলে এসব রায়ও বদলে যাবে।” অর্থাৎ বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নয়, ক্ষমতাবানদের স্বার্থই এখন প্রধান নিয়ামক।
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা আজ ভয়, প্রতিশোধ, পক্ষপাত ও রাজনৈতিক প্রভাবের এমন জটিল জালে জড়ানো যে ন্যায়বিচারের মৌল নীতিই বিপন্ন। আদালত আর নাগরিকের আস্থার কেন্দ্র নয়-বরং ক্ষমতার লড়াইয়ের মঞ্চে পরিণত হয়েছে। বিচারক, আইনজীবী, অভিযুক্ত-সবাই আজ নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তার শিকার। এই প্রেক্ষাপটে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে।
লেখক: ড. আনজুমান এ. ইসলাম একজন ইঞ্জিনিয়ার, গবেষক এবং জল ও পরিবেশ খাতের একজন শীর্ষ নেতৃত্বস্থানীয় পেশাজীবী। তিনি সমসাময়িক রাজনীতি, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ এবং ঘটনাপ্রবাহের গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রদানকারীদের মধ্যে অন্যতম।