বাংলাদেশে দায়মুক্তি পাচ্ছেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকারীরা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২১ নভেম্বর- বাংলাদেশের রাজনীতি এখন টানটান উত্তেজনার মধ্যে রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছরের গণ–অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী দমন–পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে এই রায় দেওয়া হয়। আন্দোলনের চাপে দেশত্যাগের পর অনুপস্থিতিতেই তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছিলেন। নিহতদের কয়েকটি পরিবারের কাছে এই রায় প্রতীকী ন্যায়বিচার হিসেবে দেখা দিলেও এটি দেশের রাজনীতিতে আরও বড় চাপ তৈরি করেছে। ভিন্ন মতাদর্শের অনেক রাজনৈতিক শক্তি এখন আওয়ামী লীগের বাইরে দাঁড়িয়ে এই রায়কে সমর্থন করছে, কারণ তারা হাসিনার ভূমিকার বিচার দেখতে চায়।
ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এই রায় রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রত্যাশামতোই নির্বাসিত শেখ হাসিনা রায়টি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ঢাকার অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক স্বার্থে আইসিটিকে ব্যবহার করেছে।讠২০১০ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের অপরাধ বিচার করতে এই ট্রাইব্যুনাল তিনিই গঠন করেছিলেন এবং সে সময় তাঁর সরকারের বিরুদ্ধেও রাজনৈতিকীকরণের সমালোচনা উঠেছিল।
এই রায় এমন সময় এসেছে, যখন আওয়ামী লীগ নজিরবিহীন চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দলের প্রধান নেতারা অনেকেই বিদেশে কিংবা আত্মগোপনে আছেন। মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, দলের অনেককে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। একসময় দেশের প্রতিটি এলাকায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি দেখা গেলেও এখন সেগুলো বেশির ভাগ জায়গায় সরানো হয়েছে।
যদিও দলটিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়নি, নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখা হয়েছে। রায় ঘোষণার কয়েকদিন আগেই ঢাকায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে এবং রায়ের পরও আরও ঘটনা যুক্ত হয়েছে। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
রায় ঘোষণার পর সহিংসতার ঝুঁকি বাড়িয়েছে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদের মন্তব্য। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা না উঠলে নির্বাচন ঠেকাতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তাঁর ভাষায়, আন্দোলন আরও শক্তিশালী হবে এবং প্রয়োজন হলে যা দরকার তাই করা হবে।
এ ধরনের অবস্থান সরকারকে আরও কঠোর হতে উৎসাহিত করতে পারে। এদিকে অর্থনৈতিক চাপ, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং ধীরগতির সংস্কার প্রক্রিয়ায় জনগণের হতাশা বাড়ছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারও ক্রমশ চাপের মুখে পড়ছে।
পরবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে সহিংসতার আশঙ্কা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশে আর কোনো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সহিংসতা নতুন কিছু নয়, তাই প্রচারপর্ব থেকে ভোটের দিন পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হলে বড় ধরনের অরাজকতা তৈরি হতে পারে। যদিও অনেকে মনে করেন, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের দিক থেকেই আসতে পারে, অন্য দলগুলোও সহিংসতার পথে যেতে পারে।
এ অবস্থায় দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। গত বছরের কঠোর দমন–পীড়নের পর বাহিনীর মনোবল কমে গেছে বলে অভ্যন্তরীণভাবে শঙ্কা রয়েছে। ফলে বড় ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা কতটা কার্যকর হতে পারবে তা অনিশ্চিত।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনী সময় শান্ত পরিবেশ বজায় রাখা। তা সম্ভব হলে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালন ইতিবাচকভাবে শেষ করার সুযোগ থাকবে। সরকারপ্রধান নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ছাড়া সরকারের অন্য কারও মধ্যে এই লক্ষ্য অর্জনের তাড়না খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। ইউনূস ব্যক্তিগত জীবনে ফিরতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তবে তিনি নিজের ভূমিকার কথা স্মরণ রাখবেন।
মাইকেল কুগেলম্যান প্রায় দুই দশক ধরে দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে কাজ করছেন। দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক হিসেবে তিনি মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসির সাউথ এশিয়া ব্রিফে এই লেখা লিখেছেন। বুধবার লেখাটি প্রকাশিত হয়।