মেলবোর্ন, ১০ ডিসেম্বর- দেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বছরের পর বছর ধরে অনিশ্চয়তা কাটেনি। চেয়ারম্যান ও সদস্যদের পদত্যাগের পর এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নিয়োগ হয়নি নতুন নেতৃত্ব। ফলে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটি কার্যত অচল হয়ে আছে, যখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন অভিযোগ প্রতিদিন জমা পড়লেও সেগুলোর নিষ্পত্তি হচ্ছে না।
গত বছর ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কমিশনের চেয়ারম্যানসহ সদস্যরা ৭ নভেম্বর পদ ছাড়েন। এরপর থেকে পরিচালনা কমিটি ছাড়া চলছে প্রতিষ্ঠানটি। কমিশন সূত্র বলছে, এক হাজারের বেশি অভিযোগ এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে হত্যা, ধর্ষণ, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, নিখোঁজ, গুম, হেফাজতে মৃত্যু, বিচারবহির্ভূত হত্যা, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ।
এই অচলাবস্থার মধ্যেই গতকাল আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর সংশোধিত গেজেট জারি করেছে। এতে স্বাধীন বাজেট, বিস্তৃত ক্ষমতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং নতুন করে ‘জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিভাগ’ গঠনের বিধান যুক্ত হয়েছে। সংশোধনীর উদ্দেশ্য কমিশনকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করা হলেও এখনো পুনর্গঠন হয়নি প্রতিষ্ঠানটি।
আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। বাংলাদেশেও আলোচনা সভা, মানববন্ধন ও র্যালিসহ নানা আয়োজন হয়েছে। প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘মানবাধিকার আমাদের প্রতিদিনের অপরিহার্য বিষয়’। তবে কমিশন নেতৃত্বহীন থাকায় মানবাধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
কমিশনের সচিব সেবাস্টিন রেমা জানান, নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় কমিশনের হাতে কার্যকর কোনো এখতিয়ার নেই। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা বিবৃতি দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। পরিচালক কাজী আরফান আশিক বলেন, নতুন অধ্যাদেশ কমিশনকে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাবে, তবে দ্রুত পুনর্গঠন না হলে কার্যক্রম বাধাগ্রস্তই থাকবে।
সংশোধিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কমিশনের সদস্যরা কোনো অনুমতি ছাড়াই গোপন আয়নাঘর বা আটক কেন্দ্র পরিদর্শন করতে পারবেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় যে কোনো সংস্থার সদস্য সন্দেহভাজন হলে কমিশন তদন্ত চালাতে পারবে। অপরাধের দায়ে সরকারি কর্মকর্তা বা বাহিনীর সদস্য কেউই দায়মুক্তি পাবেন না, এমন নীতিও সেখানে যুক্ত হয়েছে। নতুন ৩০(ক) ধারা অনুযায়ী ‘জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিভাগ’ গঠিত হবে, যার প্রধান থাকবেন কমিশনের চেয়ারপারসন।
এদিকে যৌনকর্মীদের মানবাধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে সংগঠন ‘সংহতি’। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে পাঠানো বিবৃতিতে সংগঠনের সভাপ্রধান মাহবুবা মাহমুদ লীনা বলেন, দেশের নাগরিক হয়েও যৌনকর্মীরা নিয়মিত বৈষম্য, উচ্ছেদ ও সহিংসতার শিকার হন এবং মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা পান না।
মানবাধিকার দিবসের দিন মানবাধিকার কমিশন অচল থাকার বিষয়টি নতুন আলোচনায় এসেছে। প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মানবাধিকার সুরক্ষা জোরদার করার উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে যদি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানই দীর্ঘদিন নেতৃত্বহীন থাকে।