মেলবোর্ন, ১১ ডিসেম্বর- বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রা এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ সময়ের প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাসের সাফল্যের পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনীতির গতি কিছুটা কমে গেছে। এর মধ্যেই উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন স্থায়ী ও শক্তিশালী বিনিয়োগ, যা নির্ভর করে পর্যাপ্ত দেশীয় রাজস্ব আহরণের ওপর। তবে কর-জিডিপি অনুপাত এখনো মাত্র ৬.৭ শতাংশ, যা ন্যূনতম প্রয়োজনের অর্ধেকেরও কম। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর মতো খাতে যথাযথ বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করহার তুলনামূলক বেশি হলেও কর কাঠামোর জটিলতা, বিভিন্ন স্তরের করহার, ভ্যাট ও আয়করে ব্যাপক ছাড় এবং এসব ছাড়ের অসামঞ্জস্য রাজস্ব ক্ষতির বড় কারণ। অনুমান করা হয়, কর ছাড়ের পরিমাণ প্রায় কর আদায়ের সমান। এতে দুর্নীতির সুযোগ বাড়ে এবং খুব কম ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কর দাখিল করে। একই সঙ্গে বাণিজ্যভিত্তিক করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা শুল্ক কাঠামোকে ভারী করে, যা রপ্তানি ও ব্যবসা সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সাহসী নীতি সংস্কারের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর জরুরি। কর কাঠামোকে সহজ, স্বচ্ছ এবং ব্যবসাবান্ধব করার পাশাপাশি এনবিআরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
সরকারের ঘোষিত কর ব্যয় নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করলে অপ্রয়োজনীয় ছাড় কমবে। প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে ছাড় বন্ধ করে সংসদীয় অনুমোদনের আওতায় আনা দরকার। প্রতিবছর কর ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করলে কোন ছাড় টিকবে আর কোনটি উঠিয়ে দেওয়া উচিত, তা নির্ধারণ সহজ হবে।
বর্তমান বহুস্তর ভ্যাটহার একীভূত করে একক হার প্রয়োগের সুপারিশ এসেছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সীমিত কিছু ছাড় রাখা যেতে পারে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যাতে কেবল সংযোজিত মূল্যের ওপর কর দেয়, সে জন্য ইনপুট ক্রেডিট ও রিফান্ড ব্যবস্থা ব্যবহারে সক্ষম করতে হবে।
কর্পোরেট করহার ২০ থেকে ৪৫ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করে। একক এবং প্রতিযোগিতামূলক হার প্রয়োগ করলে বিনিয়োগ বাড়বে। পুঁজি আয়ের করহার সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত আয়করকে আরও প্রগতিশীল করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে সম্পত্তি কর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস হতে পারে, যদি বাজারভিত্তিক মূল্যায়ন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়ানো যায়।
২০২৩ সালের জাতীয় শুল্ক নীতির আলোকে ধাপে ধাপে শুল্ক ও পরিপূরক শুল্ক কমাতে হবে। এতে রপ্তানির প্রতিযোগিতা বাড়বে। ধীরে ধীরে শুল্ক কমালে রাজস্বে চাপ কম পড়ে। একই সঙ্গে বাণিজ্য সহজীকরণের উদ্যোগ শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
কর নীতি ও কর প্রশাসনকে আলাদা করা হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় স্বচ্ছতা বাড়বে। দুটি পৃথক বিভাগ চালু করে নতুন জনবল নিয়োগ, নৈতিকতা কাঠামো শক্ত করা এবং অভ্যন্তরীণ তদারকি বাড়ানো জরুরি।
এনবিআরে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন চালু হলে রাজস্ব অনায়াসে বাড়ানো সম্ভব। এতে কর ফাঁকি কমবে, প্রশাসনে জবাবদিহি বাড়বে এবং করদাতার সেবা সহজ হবে। একীভূত কর শনাক্তকরণ নম্বর চালু হলে কর ব্যবস্থার গতি আরও বাড়বে।
বাংলাদেশের সামনে রাজস্ব বাড়ানোর পথ সহজ নয়, তবে দেশের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এই কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। অর্থনীতি শক্তিশালী করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজন।