উৎসবের মাঠে নিরাপত্তাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিকী ছবি
মেলবোর্ন, ১৮ ডিসেম্বর- নির্বাচন কমিশন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। তফসিল ঘোষণার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় গণসংযোগে নেমেছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনায় নির্বাচনী মাঠে উৎসবের আমেজের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদউল্লাহ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ওসমান হাদির ওপর হামলার পর বেশির ভাগ প্রার্থীর মধ্যেই নিরাপত্তা শঙ্কা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মাসুদুজ্জামান মাসুদ নিরাপত্তাজনিত কারণে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের উৎসবের মাঠে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে প্রার্থী ও ভোটারদের নিরাপত্তা। তবু থেমে নেই রাজনৈতিক দলগুলো। মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে গ্রাম ও মহল্লায় ঘুরে ভোটারদের সঙ্গে দেখা করছেন, সভা-সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন এবং প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারও একাধিক উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় যেসব প্রার্থী আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নিতে আগ্রহী, তাঁদের জন্য দ্রুত লাইসেন্স প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে গত সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি নীতিমালা জারি করা হয়েছে। নীতিমালা জারির পর গতকাল পর্যন্ত প্রায় ২০ জন প্রার্থী আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছেন।
পুলিশের পক্ষ থেকেও প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সভা-সমাবেশে অংশ নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জানিয়ে যাওয়ার জন্য প্রার্থীদের অনুরোধ করা হয়েছে। রাজধানীর প্রার্থীদের নিরাপত্তা জোরদারে ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।
চাঁদপুর-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলন বলেন, নিরাপত্তা নিয়ে শুধু তিনি নন, প্রায় সব প্রার্থীই শঙ্কিত। তাঁর মতে, আসন্ন নির্বাচন বানচালের জন্য অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত ষড়যন্ত্র সক্রিয় রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার এখন থেকেই প্রতিটি প্রার্থীর জন্য পর্যাপ্ত গানম্যানের ব্যবস্থা করতে পারলে হামলার ঝুঁকি অনেকটাই কমবে।
ময়মনসিংহ-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, নিরাপত্তা শঙ্কা থাকলেও মাঠে কাজ থামিয়ে রাখা যায় না। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জনবল সীমিত হলেও সভা-সমাবেশের আগে জানালে সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, ভয় পেলে ইতিহাসের বড় পরিবর্তনগুলো কখনোই ঘটত না।
চট্টগ্রাম-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী অধ্যক্ষ মুহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, নির্বাচনী বিধিমালা মেনে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন তাঁরা। তবে জনসংযোগের ফাঁকে দুষ্কৃতকারীরা সুযোগ নিতে পারে বলে একটি উদ্বেগ কাজ করছে। প্রশাসন নিয়মিত খোঁজখবর রাখছে বলেও জানান তিনি।
গত ১১ ডিসেম্বর ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদিকে পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট এলাকায় গুলি করা হয়। মাথায় গুলিবিদ্ধ হাদি বর্তমানে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন। প্রকাশ্যে এই হামলার ঘটনায় সম্ভাব্য প্রার্থী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন অনেকে।
এর আগে গত ৫ নভেম্বর চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদউল্লাহর গণসংযোগ চলাকালে চালিতাতলী এলাকায় গুলির ঘটনা ঘটে। এতে এরশাদউল্লাহসহ তিনজন আহত হন। এই ঘটনাও সারা দেশের প্রার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে গত মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী মাসুদুজ্জামান মাসুদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, পারিবারিক ও নিরাপত্তাসহ একাধিক কারণে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে আপস করা সম্ভব হচ্ছে না, তবে বিষয়টি এমন নয় যে সরকার নিরাপত্তা দিতে পারছে না।
এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, কে নির্বাচন করবে বা করবে না, তা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। নিরাপত্তা ইস্যুতে কেউ না এলে সেটিও ব্যক্তিগত ব্যাপার। কেন কেউ নির্বাচন থেকে সরে যাচ্ছে, তা অনুসন্ধান করলে বেরিয়ে আসবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম বলেন, তফসিল ঘোষণার পরও জনগণের মধ্যে সংশয় কাটেনি। ফেব্রুয়ারিতে আদৌ নির্বাচন হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, স্পষ্ট বার্তার অভাব ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য জনগণের উদ্বেগ বাড়িয়েছে এবং একটি মহল নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছে।
জেলা প্রশাসনের পর্যায়েও ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা বলেন, এখন পর্যন্ত তাঁদের এলাকায় কোনো নিরাপত্তা সমস্যা দেখা দেয়নি। নিরাপত্তা কমিটি থাকলেও কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেনি।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানান, যেসব প্রার্থীর ঝুঁকি বেশি, তাঁদের সার্বক্ষণিক গানম্যান দেওয়া হবে। গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নে ঝুঁকিপূর্ণ হলে প্রার্থীরা সশস্ত্র দেহরক্ষী রাখতে পারবেন, না পারলে পুলিশ দেহরক্ষী দেবে। পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী প্রার্থী ও জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তা তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে নিশ্চিত করা হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক রংপুর মহানগর কমিটির সভাপতি ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ভোটারদের অংশগ্রহণ ব্যাহত হতে পারে। প্রার্থী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করা সরকারের দায়িত্ব।
চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ শঙ্কার কথা বলছেন, কেউ আবার পরিস্থিতি মেনে নিয়েই মাঠে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। রংপুর ও খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রার্থীরা নিজস্ব নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে প্রচারণা চালাচ্ছেন এবং সরকারের কাছে আরও জোরালো নিরাপত্তা ব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনী মাঠে উৎসবের আবহ থাকলেও নিরাপত্তা ইস্যুই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্রঃ কালের কণ্ঠ