বাংলাদেশ

কেন ভারত ও বাংলাদেশের একটি কৌশলগত পুনর্গঠন জরুরি

  • 1:04 am - December 27, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১৪১ বার
ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২৭ ডিসেম্বর- ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর সবচেয়ে সংবেদনশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ দুই দেশের দীর্ঘদিনের কৌশলগত ধারাবাহিকতা ভেঙে দিয়েছে। গত এক দশকে যে ‘সোনালি অধ্যায়’-এর কথা বলা হতো, তা এখন অতীত। সামনে পথ নির্ধারণ করবে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রে টেকসই অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার সক্ষমতা।

২০২৫ সালের শেষ দিকে এসে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব নজিরবিহীন মাত্রায় পৌঁছেছে। অতীতে সীমান্ত ও বাণিজ্য ইস্যুতে অসন্তোষ থাকলেও, শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর সেই মনোভাব রাজনৈতিক বক্তৃতার গণ্ডি পেরিয়ে রাস্তাভিত্তিক সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৫-এ যুব নেতা শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর বিক্ষোভ তীব্র হয়। অনেক বিক্ষোভকারী এই মৃত্যুর জন্য ভারতকে দায়ী করে, যা নানা ষড়যন্ত্রতত্ত্বে উসকে দেওয়া হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনে হামলাসহ কূটনৈতিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারত সাময়িকভাবে ভিসা সেবা স্থগিত করে।

একই সময়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাও বেড়েছে। ডিসেম্বরেই হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত চরমপন্থী বয়ানের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবেও ভারতবিরোধী আবেগ ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।

ঢাকার রাজনৈতিক পালাবদলের পর ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন যুক্ত হয়েছে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ না করার সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর মতো ইসলামপন্থী শক্তির প্রভাব বেড়েছে, যাদের অবস্থান ঐতিহ্যগতভাবে ভারতবিরোধী। বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার খবর ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করছে এবং দ্বিপক্ষীয় কূটনীতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

একসময় সম্পর্কের শক্ত ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত নিরাপত্তা সহযোগিতাও এখন অনিশ্চয়তার মুখে। ভারতের আশঙ্কা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো আবার সংগঠিত হতে পারে, যা উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে বাংলাদেশে উগ্র বক্তব্য পশ্চিমবঙ্গ ও আসামসহ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দিতে পারে।

দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির বড় চ্যালেঞ্জ হলো সরকার পতনের পর সম্পর্কের পুনর্গঠন। দীর্ঘদিন ভারতের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ নীতি আওয়ামী লীগকেন্দ্রিক ছিল। বর্তমান বাস্তবতায় নয়াদিল্লিকে তরুণ নেতৃত্ব, সুশীল সমাজ এবং বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে, যাদের ২০২৬ সালের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্কও চাপের মধ্যে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতায় ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা, বাস ও রেল যোগাযোগ এবং জ্বালানি পাইপলাইনের মতো প্রকল্প স্থবির হয়েছে। ভিসা সেবা বন্ধ ও কিছু ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তি বাতিলের ফলে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা লজিস্টিক সংকটে পড়েছেন।

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন, পাকিস্তান ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের ইঙ্গিত দিচ্ছে। চীন ও পাকিস্তানকে নিয়ে সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় ঘনিষ্ঠতা নয়াদিল্লির জন্য কৌশলগত উদ্বেগ তৈরি করেছে। সরকার পরিবর্তনের পর রেল যোগাযোগ স্থগিত এবং স্থলবন্দর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বাণিজ্য ও মানুষ চলাচলও কমেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা ভারতের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এতে পশ্চিমে পাকিস্তান, উত্তরে চীন এবং পূর্বে বাংলাদেশ সীমান্তে একযোগে নিরাপত্তা চাপ বাড়বে। বিশেষ করে শিলিগুড়ি করিডর নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মাত্র ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত এই করিডর মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বাংলাদেশে পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়লে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।

চট্টগ্রাম ও মোংলার মতো বন্দর ব্যবহারের সুযোগ ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাতে গেলে বঙ্গোপসাগরে ভারতের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হতে পারে। চীনের সহায়তায় পেকুয়ায় নির্মিত সাবমেরিন ঘাঁটিও ভারতের নৌ নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগজনক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলে ভারতবিরোধী তৎপরতা বাড়ে এবং উলফার মতো গোষ্ঠীর তৎপরতার আশঙ্কা জাগে।

এই প্রেক্ষাপটে সম্পর্ক পুনর্গঠনে ভারতের প্রয়োজন বহুমাত্রিক ও বাস্তববাদী কৌশল। বাংলাদেশে সব রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ বাড়ানো জরুরি, যাতে একতরফা পক্ষপাতের ধারণা না তৈরি হয়। ২০২৬ সালে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন এবং তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে সময়মতো আলোচনা শুরু না হলে পানি নিরাপত্তা ইস্যুতে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।

রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা ভবিষ্যৎ সম্পর্কের প্রধান ভরকেন্দ্র। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩.৪৬ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নেওয়া বাংলাদেশের জন্য ভারতের সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এতে বাণিজ্য সুবিধা বজায় থাকবে এবং রপ্তানি বাড়বে। একই সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন ও আখাউড়া-আগরতলা রেলসংযোগের মতো প্রকল্প দুই দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। গভীর ঐতিহাসিক বন্ধন থাকলেও তা আর একা সম্পর্ক ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো বহুমুখী বৈদেশিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করে আঞ্চলিক বাস্তবতা মেনে নেওয়া। ভারতের জন্য পথটি হলো জনগণকেন্দ্রিক কূটনীতিতে জোর দেওয়া, সংখ্যালঘু সুরক্ষা এবং ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া। দীর্ঘমেয়াদে এই সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণ করবে সতর্ক, ধারাবাহিক এবং বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক পরিচালনা।

এই শাখার আরও খবর

গুলির মুখে সহকর্মী ও আহত ব্যক্তিকে সহায়তা: জাতীয় সাহসিকতার পুরস্কার পেলেন নেপালি বংশোদ্ভূত পুলিশ কর্মকর্তা

ওটিএন বাংলা, অস্ট্রেলিয়া: সিডনির ক্রয়ডন পার্কে গোলাগুলির সময় নিজের নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে সহকর্মী ও আহত এক ব্যক্তিকে সহায়তা করায় অস্ট্রেলিয়ার ২০২৬ সালের জাতীয় সাহসিকতার পুরস্কার…

অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রথম দুর্গাপূজা: শিক্ষার্থীদের হাত ধরে নতুন ইতিহাস

ওটিএন বাংলা, নিউক্যাসেল: পূজার আর মাত্র পাঁচ দিন বাকি। অথচ তখনও নিউক্যাসেলে পৌঁছায়নি দুর্গাপ্রতিমা। পুরোহিত, ঢাক ও পূজার প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবস্থাও চূড়ান্ত হয়নি। এর মধ্যেই…

তাহসিফের ‘জুনিয়র বন্ধু’ দীপকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করল পিবিআই

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর সঙ্গে নিখোঁজ হওয়ার আগে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় কাটানো ‘জুনিয়র বন্ধু’ দীপকে নৌ পুলিশের…

মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে চলছে ট্রাম্প-ওবামার কথার লড়াই

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারের শেষ সময়ে এসে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে শুরু হয়েছে খাবারের রেস্তোরাঁ নিয়ে পাল্টাপাল্টি কথার লড়াই।…

‘৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও প্রকৃত স্বাধীনতা এখনো আসেনি’: ফজলুর রহমান

বিশিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানী, মানবাধিকারকর্মী ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের পক্ষে আজীবন সোচ্চার ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিকের স্মরণসভায় বিএনপির সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান বলেছেন, ১৯৭১ সালে…

ক্ষমতা ধরে রাখতে নেতানিয়াহুর তৎপরতা, বিকল্প সরকার গঠনে বিরোধীদের বৈঠক

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ভোট গণনা শেষ হলেও নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসন কোনো পক্ষই…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au