বাংলাদেশ

কেন ভারত ও বাংলাদেশের একটি কৌশলগত পুনর্গঠন জরুরি

  • 1:04 am - December 27, 2025
  • পঠিত হয়েছে:৬৪ বার
ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২৭ ডিসেম্বর- ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর সবচেয়ে সংবেদনশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ দুই দেশের দীর্ঘদিনের কৌশলগত ধারাবাহিকতা ভেঙে দিয়েছে। গত এক দশকে যে ‘সোনালি অধ্যায়’-এর কথা বলা হতো, তা এখন অতীত। সামনে পথ নির্ধারণ করবে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রে টেকসই অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার সক্ষমতা।

২০২৫ সালের শেষ দিকে এসে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব নজিরবিহীন মাত্রায় পৌঁছেছে। অতীতে সীমান্ত ও বাণিজ্য ইস্যুতে অসন্তোষ থাকলেও, শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর সেই মনোভাব রাজনৈতিক বক্তৃতার গণ্ডি পেরিয়ে রাস্তাভিত্তিক সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৫-এ যুব নেতা শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর বিক্ষোভ তীব্র হয়। অনেক বিক্ষোভকারী এই মৃত্যুর জন্য ভারতকে দায়ী করে, যা নানা ষড়যন্ত্রতত্ত্বে উসকে দেওয়া হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনে হামলাসহ কূটনৈতিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারত সাময়িকভাবে ভিসা সেবা স্থগিত করে।

একই সময়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাও বেড়েছে। ডিসেম্বরেই হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত চরমপন্থী বয়ানের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবেও ভারতবিরোধী আবেগ ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।

ঢাকার রাজনৈতিক পালাবদলের পর ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন যুক্ত হয়েছে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ না করার সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর মতো ইসলামপন্থী শক্তির প্রভাব বেড়েছে, যাদের অবস্থান ঐতিহ্যগতভাবে ভারতবিরোধী। বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার খবর ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করছে এবং দ্বিপক্ষীয় কূটনীতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

একসময় সম্পর্কের শক্ত ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত নিরাপত্তা সহযোগিতাও এখন অনিশ্চয়তার মুখে। ভারতের আশঙ্কা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো আবার সংগঠিত হতে পারে, যা উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে বাংলাদেশে উগ্র বক্তব্য পশ্চিমবঙ্গ ও আসামসহ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দিতে পারে।

দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির বড় চ্যালেঞ্জ হলো সরকার পতনের পর সম্পর্কের পুনর্গঠন। দীর্ঘদিন ভারতের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ নীতি আওয়ামী লীগকেন্দ্রিক ছিল। বর্তমান বাস্তবতায় নয়াদিল্লিকে তরুণ নেতৃত্ব, সুশীল সমাজ এবং বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে, যাদের ২০২৬ সালের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্কও চাপের মধ্যে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতায় ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা, বাস ও রেল যোগাযোগ এবং জ্বালানি পাইপলাইনের মতো প্রকল্প স্থবির হয়েছে। ভিসা সেবা বন্ধ ও কিছু ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তি বাতিলের ফলে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা লজিস্টিক সংকটে পড়েছেন।

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন, পাকিস্তান ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের ইঙ্গিত দিচ্ছে। চীন ও পাকিস্তানকে নিয়ে সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় ঘনিষ্ঠতা নয়াদিল্লির জন্য কৌশলগত উদ্বেগ তৈরি করেছে। সরকার পরিবর্তনের পর রেল যোগাযোগ স্থগিত এবং স্থলবন্দর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বাণিজ্য ও মানুষ চলাচলও কমেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা ভারতের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এতে পশ্চিমে পাকিস্তান, উত্তরে চীন এবং পূর্বে বাংলাদেশ সীমান্তে একযোগে নিরাপত্তা চাপ বাড়বে। বিশেষ করে শিলিগুড়ি করিডর নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মাত্র ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত এই করিডর মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বাংলাদেশে পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়লে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।

চট্টগ্রাম ও মোংলার মতো বন্দর ব্যবহারের সুযোগ ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাতে গেলে বঙ্গোপসাগরে ভারতের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হতে পারে। চীনের সহায়তায় পেকুয়ায় নির্মিত সাবমেরিন ঘাঁটিও ভারতের নৌ নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগজনক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলে ভারতবিরোধী তৎপরতা বাড়ে এবং উলফার মতো গোষ্ঠীর তৎপরতার আশঙ্কা জাগে।

এই প্রেক্ষাপটে সম্পর্ক পুনর্গঠনে ভারতের প্রয়োজন বহুমাত্রিক ও বাস্তববাদী কৌশল। বাংলাদেশে সব রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ বাড়ানো জরুরি, যাতে একতরফা পক্ষপাতের ধারণা না তৈরি হয়। ২০২৬ সালে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন এবং তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে সময়মতো আলোচনা শুরু না হলে পানি নিরাপত্তা ইস্যুতে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।

রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা ভবিষ্যৎ সম্পর্কের প্রধান ভরকেন্দ্র। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩.৪৬ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নেওয়া বাংলাদেশের জন্য ভারতের সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এতে বাণিজ্য সুবিধা বজায় থাকবে এবং রপ্তানি বাড়বে। একই সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন ও আখাউড়া-আগরতলা রেলসংযোগের মতো প্রকল্প দুই দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। গভীর ঐতিহাসিক বন্ধন থাকলেও তা আর একা সম্পর্ক ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো বহুমুখী বৈদেশিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করে আঞ্চলিক বাস্তবতা মেনে নেওয়া। ভারতের জন্য পথটি হলো জনগণকেন্দ্রিক কূটনীতিতে জোর দেওয়া, সংখ্যালঘু সুরক্ষা এবং ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া। দীর্ঘমেয়াদে এই সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণ করবে সতর্ক, ধারাবাহিক এবং বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক পরিচালনা।

এই শাখার আরও খবর

ফুটবল বিশ্বকাপে যেভাবে ‘সুরের মুখ’ হয়ে ওঠার উঠলেন শাকিরা

মেলবোর্ন, ২৪ জুন- বিশ্বসঙ্গীতের ইতিহাসে খুব কম শিল্পীই আছেন যারা ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে এত গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছেন। কলম্বিয়ার গায়িকা, গীতিকার ও নৃত্যশিল্পী শাকিরা তাদের মধ্যে অন্যতম।…

শিগগিরই খুলছে না মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, বাধা কোথায়

মেলবোর্ন, ২৪ জুন- বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এগোলেও তা দ্রুত বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।…

হোয়াটসঅ্যাপ প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেলেন ভারতের কুনাল শাহ

মেলবোর্ন,  ২৪ জুন- বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ভারতের খ্যাতনামা প্রযুক্তি উদ্যোক্তা কুনাল শাহ। হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক ও…

গ্রেপ্তার এড়াতে পালানোর সময় আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু

মেলবোর্ন, ২৪ জুন- বরিশাল নগরীতে গ্রেপ্তার এড়াতে পালানোর সময় রাশেদ খান মেনন (৫০) নামে আওয়ামী লীগের এক নেতার মৃত্যু হয়েছে। তিনি নগরীর ১ নম্বর ওয়ার্ড…

ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতায় লাগাম টানল মার্কিন সিনেট, ইরান ইস্যুতে অনুমোদন বাধ্যতামূলক

মেলবোর্ন, ২৪ জুন- ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত করতে যুদ্ধক্ষমতা–সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে…

ঢাকায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ২৬ নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার

মেলবোর্ন, ২৪ জুন- রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর ২৬ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। মঙ্গলবার পৃথক…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au