বিশ্ব

সিএনএনের বিশেষ প্রতিবেদন

প্রশ্নের মুখে ট্রাম্পের যুদ্ধ কৌশল, চুক্তিকে ব্যর্থতা মনে করছেন অধিকাংশ মার্কিন

  • 2:22 pm - June 24, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২১৫ বার
প্রশ্নের মুখে ট্রাম্পের যুদ্ধ কৌশল। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২৪ জুন- ইরানের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরের পর পরিচালিত প্রথম বড় জনমত জরিপে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের গভীর হতাশার চিত্র। জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক চান যুদ্ধের দ্রুত অবসান হোক। তবে এর অর্থ এই নয় যে তারা চুক্তিটিকে সফল বা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাভজনক বলে মনে করছেন। বরং অনেকের মতে, যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগতভাবে দুর্বল করেছে এবং প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শেষ করার পক্ষে জনসমর্থন বাড়লেও ইরান নীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের সাফল্য নিয়ে জনমনে সন্দেহ ও অসন্তোষ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

যুদ্ধের অবসান চান অধিকাংশ মার্কিন

সিবিএস নিউজ ও ইউগভ পরিচালিত সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা যায়, ৭৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের দ্রুত অবসানের পক্ষে মত দিয়েছেন। মাত্র ২২ শতাংশ মনে করেন, আরও সময় নিয়ে ইরানের কাছ থেকে অতিরিক্ত ছাড় আদায়ের চেষ্টা করা উচিত।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফলকে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বরং এটি যুদ্ধ নিয়ে জনগণের ক্লান্তি ও উদ্বেগের প্রতিফলন। দীর্ঘ সংঘাত, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ দ্রুত পরিস্থিতির অবসান চাইছেন।

চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাভজনক মনে করছেন না অধিকাংশ মানুষ

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মাত্র ২২ শতাংশ মনে করেন, সমঝোতা চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশি সুবিধাজনক হয়েছে। বিপরীতে ৩৭ শতাংশের মতে, চুক্তি থেকে বেশি লাভবান হয়েছে ইরান। আর ৪১ শতাংশের ধারণা, উভয় পক্ষই প্রায় সমান সুবিধা পেয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই দাবি করে আসছিল, এই যুদ্ধ ও পরবর্তী চুক্তির মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা সম্ভব হবে। কিন্তু জনমত জরিপ বলছে, সেই দাবিতে আস্থা নেই অধিকাংশ মানুষের।

পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ হবে না, মনে করেন ৬৯ শতাংশ মার্কিন

জরিপে অংশ নেওয়া ৬৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিকের বিশ্বাস, যুদ্ধ শেষে হওয়া এই চুক্তি ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থামাতে পারবে না। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির ৪৫ শতাংশ সমর্থকও একই মত পোষণ করেছেন।

এর আগে জুন মাসে পরিচালিত আরেকটি জরিপেও একই ধরনের ফলাফল দেখা গিয়েছিল। সেখানে অধিকাংশ ভোটার মনে করেছিলেন, শান্তিচুক্তি হলেও ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ থেকে পুরোপুরি সরানো সম্ভব হবে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা স্থায়ীভাবে ধ্বংস করা। কিন্তু জনগণ যদি বিশ্বাসই না করে যে সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে, তাহলে পুরো কৌশলই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

জরিপে দেখা গেছে, ৪৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ইরান যুদ্ধ কৌশলগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যর্থ হয়েছে। মাত্র ২৯ শতাংশ এটিকে সফল বলে মনে করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক মূল্যায়ন নয়; বরং যুদ্ধের সামগ্রিক ফলাফল সম্পর্কে জনগণের হতাশার প্রতিফলন। অনেকেই মনে করছেন, যুদ্ধের দীর্ঘ সময় পার হলেও যুক্তরাষ্ট্র দৃশ্যমান কোনো কৌশলগত অর্জন দেখাতে পারেনি।

ইরান এখনো শক্তিশালী, বলছেন অধিকাংশ নাগরিক

জরিপে অংশ নেওয়া ৩৮ শতাংশ মানুষ বলেছেন, যুদ্ধ শুরুর আগের মতোই শক্তিশালী রয়েছে ইরান। আরও ২৫ শতাংশ মনে করেন, যুদ্ধের পর ইরান আগের চেয়েও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে।

অর্থাৎ প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৬ জনেরও বেশি মার্কিন নাগরিকের ধারণা, যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানকে দুর্বল করা সম্ভব হয়নি।

ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছিল, সামরিক হামলায় ইরানের সক্ষমতা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের বড় অংশ সেই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নন।

জরিপে অংশগ্রহণকারী ৫৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিকের মতে, ইরান যুদ্ধ সমস্যার সমাধানের চেয়ে নতুন সমস্যা বেশি সৃষ্টি করেছে। বিপরীতে মাত্র ২১ শতাংশ মনে করেন, যুদ্ধ ইতিবাচক সমাধান এনে দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে। জনগণের বড় অংশ মনে করছে, সংঘাতের কারণে আঞ্চলিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতির প্রভাব মূল্যায়নে ব্যর্থ ছিল ট্রাম্প প্রশাসন

জরিপে ৬৪ শতাংশ নাগরিক বলেছেন, যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যেও ৫১ শতাংশ একই মত দিয়েছেন।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকট বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্য প্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইরান এই সংকটকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের গুরুত্ব আবারও প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।

জরিপে ৬৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বলেছেন, চুক্তি হলেও ইরান ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর প্রতি হুমকিমূলক আচরণ বন্ধ করবে না।

এ ছাড়া ৭৯ শতাংশ মনে করেন, এই সমঝোতা ইরানের শাসকদের যুক্তরাষ্ট্রপন্থী করে তুলতে পারবে না। আবার ৭৪ শতাংশের মতে, চুক্তিটি ইরানের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আনবে না।

যুদ্ধ শেষ করতে চাইছে জনগণ, চাইছে প্রশাসনও

সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমানে একটি বিষয়ে মার্কিন জনগণ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান প্রায় একই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। উভয় পক্ষই দ্রুত এই সংঘাতের অবসান চাইছে।

জরিপে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন তাদের ঘোষিত সব লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটানোর জন্য চুক্তিতে পৌঁছেছে।

প্রাথমিকভাবে চার থেকে ছয় সপ্তাহের সংঘাত হিসেবে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা প্রায় চার মাস ধরে চলেছে। এই দীর্ঘ সময়ে প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ায় জনগণের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। ফলে অনেক মার্কিন নাগরিক এখন মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসনও শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য অর্জনের চেয়ে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনমতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, জনগণ যুদ্ধকে সফল কৌশল হিসেবে দেখছে না। বরং অধিকাংশ নাগরিকের ধারণা, এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে এবং ইরানের ওপর প্রত্যাশিত চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি। ফলে সমঝোতা চুক্তি কার্যকর হলেও ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান নীতি নিয়ে বিতর্ক ও প্রশ্ন আপাতত শেষ হচ্ছে না।

সূত্রঃ সিএনএন

এই শাখার আরও খবর

শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে বাংলাদেশে ফের ক্ষমতার পালাবদলের আশঙ্কা কতটা?

বাংলাদেশে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশে আবারও রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে নর্থইস্ট নিউজের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।…

নেতানিয়াহুর জোটে ভাঙন, রোববার সরকার গঠনের দায়িত্ব পেতে পারেন আইজেনকোট

ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গঠনের জন্য রোববারের মধ্যে একজন প্রার্থীকে দায়িত্ব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পরিবর্তে বিরোধী নেতা ও সাবেক…

চুয়াডাঙ্গা বালিকা বিদ্যালয়ের দেয়ালে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান লিখল ছাত্রীরা, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ

চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনের দেয়ালে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় হাসিনা’, ‘মুজিব সেনা’ ও ‘ফিরছি আবার ডিসেম্বর’সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক স্লোগান লেখাকে কেন্দ্র করে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা…

ইতালীয় প্রতিরক্ষা প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফর, ইউরোফাইটার টাইফুন কেনার উদ্যোগে নতুন করে আলোচনা

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জন্য ইউরোপীয় নির্মিত বহুমুখী যুদ্ধবিমান ইউরোফাইটার টাইফুন কেনার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতালির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিরক্ষা প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফরকে কেন্দ্র…

‘১৩ নভেম্বর পৃথিবীর ধ্বংস’: ৬৬ বছর আগের ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে নতুন করে আলোচনা কেন?

২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর শুক্রবার। দিনটি যত ঘনিয়ে আসছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি আরব গণমাধ্যমে ততই নতুন করে আলোচনায় আসছে ‘পৃথিবীর ধ্বংস’ বা মহাপ্রলয়ের একটি…

ট্রাম্প প্রশাসনে রদবদলের গুঞ্জন, পদত্যাগের খবর নাকচ করলেন রুবিও ও হেগসেথ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে রদবদলের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au