মেলবোর্ন, ২১ জানুয়ারি- কোনো উদ্যোগেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, বরং উল্টো বেড়েছে। বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কমা, জ্বালানি তেলের দরপতন, ডলার সংকট অনেকটাই কেটে যাওয়া, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য আবার উদ্বৃত্তে ফেরা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ার মতো ইতিবাচক অর্থনৈতিক সূচক থাকার পরও দেশের বাজারে স্বস্তি আসেনি। বরং নিত্যপণ্যের দাম বাড়তেই থাকছে, সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও কমছে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পরামর্শে যে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি চালু আছে, তা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর হয়নি। এর মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনি অর্থনীতি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সরকারি ব্যয়, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের খরচ, বাজারে বাড়তি নগদ টাকার প্রবাহ এবং রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ফলে তারল্য বাড়লেও এর বড় অংশ যাচ্ছে অনুৎপাদনশীল খাতে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বেড়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং সংস্কার ইস্যুতে গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে সরকারি ব্যয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকদের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রবাসীরাও পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে অর্থ পাঠাচ্ছেন, যার একটি অংশ রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে আসছে। ফলে বাজারে নগদ অর্থের সরবরাহ বাড়লেও তা উৎপাদনশীল খাতে না গিয়ে মূলত ভোগব্যয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পণ্যের দামে।
বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশে তার সুফল মিলছে না। ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে চাল, গম, ভোজ্যতেল, চিনি, দুধের গুঁড়া ও জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ২০ ডলার কমেছে, চালের দাম টনপ্রতি কমেছে ৬০ ডলারের বেশি। পাম অয়েল, সয়াবিন তেল ও গমের দামও কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এসব পণ্যের খুচরা দাম কমেনি, অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে। আমদানি মূল্য ও বাজারমূল্যের ব্যবধান বাড়তে থাকায় প্রশ্ন উঠছে বাজার তদারকি ও প্রতিযোগিতা নিয়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব, দুর্বল তদারকি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যই এর মূল কারণ। কৃষক পর্যায়ে দাম কমলেও ভোক্তা পর্যায়ে তার সুফল না পৌঁছানো সরবরাহ ব্যবস্থার বড় দুর্বলতার দিকটি তুলে ধরে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে নীতি সুদহার বাড়িয়ে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে নেওয়া হলেও মূল্যস্ফীতি কমেনি। বরং উচ্চ সুদের কারণে বিনিয়োগ কমেছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি শ্লথ হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি মূলত চাহিদাজনিত নয়, বরং সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনার সমস্যার ফল। তাই শুধু সুদহার বাড়িয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা যাচ্ছে না।
নির্বাচনকে ঘিরে বাড়তি ব্যয়ও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে। চলতি অর্থবছরে নির্বাচন কমিশনের জন্য বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রার্থীদের প্রচার ব্যয়, ডিজিটাল প্রচারণা, পোস্টার-ব্যানার ও শোডাউনের খরচ। এতে একদিকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে সাময়িক কর্মসংস্থান হলেও অন্যদিকে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে পণ্যের চাহিদা ও দাম বাড়ছে।
নির্বাচনী ব্যয়ের বড় অংশই আসে কালোটাকা থেকে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট জিডিপির বড় একটি অংশই কালোটাকার আওতায়। নির্বাচনকালে এই অর্থ বাজারে সক্রিয় হয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ায়।
রেমিট্যান্স প্রবাহও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম ১৯ দিনেই দেশে এসেছে দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই ডলার কিনে বিপুল পরিমাণ টাকা বাজারে ছেড়েছে। এতে ব্যাংক ও গ্রাহকদের নগদ টাকার চাহিদা বেড়েছে এবং বাজারে অর্থের সরবরাহ আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকেই খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল উচ্চ পর্যায়ে। বছরজুড়ে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন, রমজান ও ঈদের অতিরিক্ত চাহিদায় পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী যেখানে মূল্যস্ফীতি কমছে, সেখানে বাংলাদেশ ব্যতিক্রম হয়ে উঠেছে। আইএমএফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ৩ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে। ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। অথচ বাংলাদেশে তা প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশে আটকে আছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ব্যবধান দেখায় যে বাংলাদেশের সমস্যা মূলত বাজার কাঠামো ও সরবরাহ ব্যবস্থায়। চার বছর ধরে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি চালিয়েও যখন কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না, তখন স্পষ্ট হচ্ছে যে শুধু সুদহার বাড়ানো দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর হস্তক্ষেপ, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো কঠিন হয়ে পড়ছে।