ইংল্যান্ডে বাড়ছে কমবয়সী নারীদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উদ্বেগ বিশেষজ্ঞদের। ছবি: সংগৃহিত
মেলবোর্ন, ২৩ জুলাই: ইংল্যান্ডে ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গবেষকরা। তাদের মতে, কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে এবং এর সঙ্গে স্থুলতার হার বৃদ্ধির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। গবেষকরা ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস)-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র তুলে ধরেছেন।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, টাইপ-২ ডায়াবেটিস শুধু রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায় না, এটি হৃদ্রোগ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, কিডনি বিকল হওয়া, দৃষ্টিশক্তি হ্রাসসহ নানা জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। অল্প বয়সে এই রোগে আক্রান্ত হলে জটিলতা আরও দ্রুত দেখা দিতে পারে এবং আয়ুও কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের হার দ্রুত বাড়ছে। এর মধ্যে ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী নারীদের আক্রান্ত হওয়ার হার সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। একই সময়ে কমবয়সীদের রোগ শনাক্তের সময় বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গবেষকদের মতে, এটি ইঙ্গিত করে যে স্থুলতার বাড়তি হারই এ প্রবণতার অন্যতম প্রধান কারণ।
এনএইচএসের পৃথক তথ্য অনুযায়ী, কোভিড মহামারির পর ইংল্যান্ডে স্থুলতার হার বেড়েছে। বর্তমানে দেশটির প্রতি তিনজনের একজন স্থুলতার ভুগছেন।২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে নতুন স্থুলতার ঘটনা ১৬ শতাংশ এবং ৩০ থেকে ৩৯ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে ৬০ থেকে ৭৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এই হার কমেছে।
গবেষণার প্রধান গবেষক ডা. শিভানি মিশ্রা বলেন, কম বয়সে গুরুতর স্থুলতয় আক্রান্ত হওয়ার কারণে অনেকের টাইপ-২ ডায়াবেটিসও আগে ভাগেই ধরা পড়ছে।তার ভাষায়, “এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ অল্প বয়সে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হলে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যগত ক্ষতির ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।”
ডা. মিশ্রা বলেন, আগে ধারণা করা হতো, কিছু জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যেই টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেশি। তবে নতুন তথ্য বলছে, এখন শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মধ্যেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। অর্থাৎ সমস্যাটি এখন আরও বিস্তৃত জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে।
ডায়াবেটিস ইউকের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ভুগছেন। এনএইচএস ইংল্যান্ডের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ৩০ বছরের কম বয়সী প্রায় ১২ হাজার মানুষ টাইপ-২ ডায়াবেটিস নিয়ে জীবন যাপন করছেন। এদের মধ্যে নারীর সংখ্যাই বেশি।
টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে- সব সময় অতিরিক্ত তৃষ্ণা অনুভব করা, স্বাভাবিকের তুলনায় ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, ক্লান্তি অনুভব করা, ওজন কমে যাওয়া, ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া, বারবার সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়া।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ডায়াবেটিস ইউকের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে টাইপ-২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা এমনকি রোগটিকে রেমিশনে নেওয়াও সম্ভব।
গবেষকদের মতে, জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের স্থূলতা কমানোর ওষুধ, যেমন জিএলপি-১ (GLP-1) ইনজেকশন ও ট্যাবলেটও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এদিকে, গর্ভাবস্থায় জেস্টেশনাল ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীদের সন্তান জন্মের পর নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে ডায়াবেটিস ইউকে। কারণ তাদের পরবর্তীতে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার পর টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সুত্র: বিবিসি